রবিবার, ৯ জুলাই, ২০১৭

সদাপুরাণ -২০

অশোক দেব
সদাপুরাণ-২০

‘কে বলে শারদ শশী সে মুখের তুলা
পদনখে পড়ি তার আছে কতগুলা
কি ছার মিছার কাম ধনুরাগে ফুলে
ভুরুর সমান কোথা ভুরুভঙ্গে ভুলে
কাড়ি নিলো মৃগমদ নয়নহিল্লোলে
কাঁদে রে কলঙ্কী চাঁদ মৃগ লয়ে কোলে’

     উঠানে দাঁড়িয়েই এই শুরু করে মানিক শীল। রবিবার সকালে চুল কাটার চেয়ার আপনি বসে যায় কামরাঙ্গা গাছের নীচে। মানিক শীল তার ছোট বাক্স নিয়ে হাজির হয়। এসেই জরিনার ঘরের সামনে টেনে টেনে সুর করে এইসব শোল্লক বলে। জরিনা বেরিয়ে এসে এই প্রৌঢ়ের দিকে তাকায়। হাসে। কিছু কিছু মানুষ দারিদ্র্যকে সাজাতে জানে। যা আছে, তাকেই। মানিক শীল তেমনি। পরিমিত নীল দিয়ে সাদা ধূতিকে উজ্জ্বল করা হয়েছে। একটা হাতাকাটা পাঞ্জাবি, ঘিয়ে রঙের। সেটাও বেশ স্পষ্ট করে পরা। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে জরিনা। মানিক শীলের একটা দোলন আছে। হাল্কা। দুলে দুলে বলে ওইসব কবিতা। জরিনা এক সময় ঠাস করে একটা সাবানের কেস রাখে। তাতে সুগন্ধি সাবান। চুল কাটার আগে সে দিয়ে হাত ধুয়ে আসতে হবে। রহিম মিয়াঁর নির্দেশ। ‘মানিক্যার সব বালা, হাতের গন্ধ বালা না’। সাবানটা রেখে ঘরে ফিরে যায় জরিনা। তাতেই মানিক শীল যোগ করেঃ
‘মেদিনী হইল মাটি নিতম্ব দেখিয়া
অদ্যাপী কাঁপিয়া উঠে থাকিয়া থাকিয়া
করিকর রামরম্ভা দেখি তার উরু
সুবলনি শিখিবারে মানিলেন গুরু’

     রহিম মিয়াঁ চেয়ারে বসে তাকে ডাকেন। অন্যদিন চুল কাটার সময় ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। আজ ঘুম নেই। ওই রাস্তায় একটা লরি যায়। বারবার। সেটাতে মাটি টানা হচ্ছে। আজকাল দুমদাম পুকুর ভরিয়ে ফেলছে মানুষ। নিচু জমিও। টপাটপ বাড়ি উঠে যাচ্ছে। পাকা। কারা যেন কোথা হতে সব আসে। ‘এত সিমেন্ট পায় ক্যামনে?’
- সদা মিয়াঁ

     আমাকে ডাকেন গপিস্ট রহিম। আমিও চুল কাটানোর জন্য চলে আসি এবাড়ি। দোকানে যেতে হয় না। কু-কু শোনারও ঝামেলা নেই। হাতে করে একটা বই নিয়ে আসো। পড়তে থাকো। বাকিদের কাটা শেষ হলে গিয়ে চেয়ারে বসে পড়ি। মানিক শীলেরও লাভ তাতে। খুশিও হয়। আচমকা রহিম মিয়াঁর ডাক শুনে কাছে যাই।
- কন
- এত সিমেন্ট পায় কই?
- ক্যান বাজারে?
- বাজারে সিমেন্ট পাওয়া যায়? রডও?
- হ্যাঁ, গৌতইম্যাও তো রড সিমেন্টের দোকান দিল
- তাইলে আগের মতন ফুড অফিসে দরখাস্ত দেওন লাগে না?
- না না, হেইদিন গেছে গা, অহন ওপেন মার্কেট
- হিডা কিতা?
- লাইসেন্স মাইসেন্স নাই... বাজারে সব খোলা...
- এই যে পুস্কনি সব ভইরা যাইতাছে... জমি... অত টেকা কই থিকা...
- কিতা কমু কন...
- হুম

     এইবার মনে হয় ঘুমিয়ে পড়লেন। নীরব হয়ে গেলে সরে এলাম। ওইদিকে লালুমজিদ সেই বাঁশি বাজানোর চেষ্টা করছিল। হয় না। লরিটা ঠিকই বিচ্ছিরি শব্দ করে আসে। যাবার সময় শব্দ কম। আসার সময় মাটির ভারে গোঙায় বেশি। তখন মজিদ চুপ থাকে। লরির শব্দ না থাকলে বাজায়, কেন যে সেটা হয় না।
- মজিদ ভাই
- কন
- ইডা মনেলয় অইতো না...  এই বাঁশি বাজানডা...
- মালুম হ্যায়
- তাইলে... ক্যান?
- সদাভাই... সবচে কঠিন কিতা কন তো?
- কী?
মা
- মানে?
- ও মা স্বরটা লাগে না আমার... লাগেই না... আইচ্ছা, মা হইতে কেমন লাগবো কন তো
- বুঝলাম না
- এই যে পোলাপানে মা কইয়া ডাক দেয়, তখন মাইয়ালোকের কী হয়? বুকের মিধ্যে কিতা হয়? হিডা ঠাহর করতাম পারি না। কত রকমের মা-ডাক আছে...
- কেমন?
-ক্ষুধা লাগলে একরকম, দুঃখ পাইলে একরকম, পইড়া গিয়া ছইরা গেলে একরকম, মা-র উপরে রাইগ্যা গেলেও মা-ডাক একরকম...
- স্ট্রেঞ্জ
- এইসব মা-ডাক যে বাজাইতে জানে না, হে কী বাজাইবো
মজিদ ভাইয়ের কাছে এলে মনখারাপ হয়ে যায়। কী কী যে ভাবে বসে বসে। টুক করে জরিনা আসে বারান্দায়, হাতছানি দিয়ে ডাকে। আবার ঘরে ঢুকে যায়।যাই।
- আমার ছানের পুস্কনি লাগতো না
- কী কন?
- না, আমি আর জলে নাইম্যা ছান করি না। এই জীবনে আর করতাম না। ঠাহুররে কন হিডা ভইরা লাইতো... গাড়ির মাডি দিয়া...
- আমি?
- আমনেই কন, ওই গপিস্ট ঠাহুর আমনের কতা হুনবো... আজগাই কইবেন... এক্ষণ কইবেন, যান...
   বিপদে ফেলে দেয় ভাবি। পুকুর ভরিয়ে ফেলার কথা বললে গপিস্ট আমাকে এ বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিতে পারে। আবার না বললে, জরিনা বন্ধ করে দেবে। যা হবার হবে, আমি যাই গপিস্টের কাছে। তখনও কাঁচির ওই শব্দটা হয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে চিরুনিতে বাড়ি দিয়েও একটা শব্দ করে মানিক শীল। ভেবেছি রহিম ঘুমিয়ে পড়েছেন কাছে যেতে বুঝলাম কথা বলছেন ধীরে ধীরে।
- মানিক
- কন
- তুই যে শোল্লক কস, ইডি কার লেখা জানস?
- আরে না না... আমি হুইন্যা হুইন্যা শিখছি... কার থিকা হুনছি হিডাই ভুইলা গেছি
- ইডার নাম বিদ্যাসুন্দর। লেখছেন ভারতকবি।
- ও
- রাজারা এই জিনিস পড়ন বন্ধ কইরা দিছিলো। এদিকে  অবইশ্য বেশি একটা পড়া অইতো না। আগত্তলার মাইনসে পড়তো। সইন্দাবেলা হারিকেন জ্বালাইয়া... রাজার মানুষ ঘুরত লাডি লইয়া...
- কন কী?
- হুম, পোলাপানের মাতা খারাপ করতো ইডা। মাইয়ালোকের করতো বেশি। যত ঘেঁষাঘেঁষি আর ডলাডলির কতা... ইতান পইড়া উচ্ছন্নে যাওনের যোগাড়...
- তই
- তই আর কি... রাজার মাইনসে বই পাইলে পুইরা লাইতো আগুন দিয়া...
- আমনে পড়ছেন?
- ‘কিবা রূপ কিবা গুণ কহিলেন ভাট
খুলিল মনের দ্বার না লাগে কপাট
প্রাণধন বিদ্যালাভ ব্যাপারের তরে
খেয়াব তনুর তরী প্রবাস সাগরে.
যদি কালী কূল দেন কূলে আগমন
মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’
- আরে? আমনে তো বাক্কা

     আজ আর ওসব বলে লাভ নেই। কোথা হতে সরাইল্যা লালু এলো। লালুমজিদ যেনো কোথায়। কুকুরটা তার নিজের জায়গায় বসে। দূরে কাদের বাড়িতে বেজে ওঠে কাঁসর, উলুধ্বনি... সরাইল্যা তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে শব্দ করে। ওপরের দিকে মুখ করে সে ডাকে। দূর হতে জরিনা আমাকে দেখছিল।রহিমকে আসল কথা না বলে ফিরে আসছি দেখে আবার হাতছানি দেয়। একটু হাসেও। দ্রুত নাড়ায় হাত। বুঝলাম তাড়াতাড়ি যেতে হবে। ঘরে ঢুকতেই দেখি সেই আরামচেয়ারটা। এটা জানালার কাছে। এখানে বসে জরিনা আলো খায়। সেই চেয়ারে বসে আছে মিট্টি। অবাক কাণ্ড! কেমন একটা ভাব, যেনো তাকে কেউ বেঁধে রেখেছে। ঘরে একটা গন্ধ। নতুন। মিট্টির পায়ের সামনে বসে আছে মজিদভাই। জরিনার ভাব দেখে বুঝলাম বসানো হয়েছে। ঘটনা বোঝা যাচ্ছে না কিছু। বিকৃত শব্দ করে মাটির লরি যাচ্ছে পাশের রাস্তায়। পথের সে ধুলা যেনো সর্বত্র ছড়ানো।
- ‘বাজান’, জরিনা আদেশ করে...
মজিদভাই একটা মোটা বাঁশিকে ঠিকঠাক করে ঠোঁটের কাছে ধরে। বাজায় না।
-   বাজান
এবার বাজে বাঁশি। সত্যিই যেনো কেউ করুণ করে মা ডাকছে...
-   আরেকটা বাজান
এবার ঢেউ তুলে তুলে মজিদ এসে সেই মা-তে স্থির হয়...
-   ইয়ে সব কা হো রাহা হায়?
মিট্টি প্রশ্ন করতেই জরিনা তার বুক আর পেটের মাঝখানে পা রাখে
- বাইদ্যানি... তুই ফিরা ফিরা আইয়স কেরে? কেরে?
- হাজারবার আয়ুঙ্গি
বলেই ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়ায়। টাল রাখতে পারে না জরিনাভাবি। ছিটকে বিছানায় পড়ে যায়। মিট্টি দুমদাম করে বেরিয়ে যেতে গিয়ে কেড়ে নিতে চায় মজিদের বাঁশি। লালুমজিদ বাঁশি ছাড়ে না। একটু চেষ্টা করে সেটা ছাড়াই বেরিয়ে যায় মিট্টি।
- কী বিষয়?আমি জানতে চাই।
- তাই খালি ঘুরঘুর করে... অহন মাডির গাড়ির লেবার হইছে... কাম তো ছাতাও করে না... তাইনের বাঁশির সামনে আইয়া বইয়া থাহে... কানতো চায়...
- তো আমনের কী?
এই কথা বলে উঠে বেরিয়ে যেতে চায় মজিদভাই।‘আমনের কিতা যায়?’
-   সব যায়, শালারপুত... সব যায়... সব যায়...
হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি। কী করবো? মিট্টি চলে গিয়েছিল। আবার ফিরে এসেছে। সোজা চলে আসে ঘরের সামনে। চিৎকার করে...
-   তু মরেগি... পাগল হো যায়েগি... পেটকে আন্দার বাল উগে গা...
     এই প্রথম কেমন যেনো উদাস হয়ে গেলো জরিনার দৃষ্টি। একটু তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণেই সেই পুরনো জরিনা। মজিদভাইয়ের বাঁশিটা সে মাটিতে ফেলে। পা দিয়ে আঘাত করে জোরে। বাঁশিটা প্রথমে ফাটে, পরে ভেঙে চেপ্টা চেপ্টা হয়। জরিনা পাগলের মত পা চালাতে থাকে। সে শোনে না, কিছু শোনে না। প্রতিটি আঘাতে বাঁশিটার থেকে একটা শব্দ বেরোচ্ছিল। আমি স্পষ্ট শুনলাম, মা মা মা  



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন