বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২০

ডোবারম্যান



অশোক দেব

ডোবারম্যান


এক

শুয়ে অন্ধকারে চোখ মেলে থাকাটাই ঘুম। সদানন্দের নিদ্রা। চোখের সাম্নে নানা রঙের বলয় তৈরি হতে থাকে। কখন ভোর হবে ভাবতে ভাবতে ভোর হয়। পাখি ডাকে, ঠিক তখন কিচ্ছু না জানিয়ে সদার ঘুম আসে।

সদানন্দ স্বপ্ন দ্যাখে। দ্যাখে, একটি ঘর, মেঝে একদম তকতকে, মন্দির যেমন। ছাদ থেকে ঘণ্টার মতো ঝুলছে অসংখ্য রাবারের তৈরি পুরুষাঙ্গ। দুলছে। কখনো, কোনো কোনো সময় এসবকে আসল বলে মনে হয়। গা বেয়ে রক্তও ঝরতে দেখা যায়। মেঝের মাঝখানে শুকনো রক্তের আলপনা। তাতে বসে আছে রানী মাসি পদ্মাসনে। নগ্ন, টান টান। চোখ আধবোজা। পুরো ঘরটার একটা উলটো ছবি মেঝের মধ্যে বিম্ব। সদানন্দ ঘুম ভেঙে তড়াক করে উঠে বসে।

ভয়ে ভয়ে নিজেকে একবার আঁতিপাঁতি খুঁজে দেখে স্বপ্নটাকে ভুলে যায়।
এসব আবার আরেকজন জানে কীভাবে? জানি, কারণ, সদা এমন একজন যে, অনেক সময় সে শুধু ঠোঁট নাড়ে, কথাগুলো বলে দিই আমি। সিনেমায় যেমন গান হয়।

সকাল হল। সবকিছু ওপাশে রেখে বেজে ওঠে নটার সাইরেন। ওয়াটার সাপ্লাইয়ের কল তিনবার হেঁচকি তুলে জল দেয়া বন্ধ করল প্রায়। খড়ধোয়া। অফিস টান দিল হ্যাঁচকা টানে পায়খানার লাইন। কোথাও জাগল হরতাল। কাশ্মীর জাগল। পাঞ্জাব জাগল। খবরের কাগজ জেগে ওঠে আর সদানন্দ বিড়ির কৌটোকে ডাকে। দেশলাই ডাকে। কাঁথায় পিঁচুটি মোছে, বিড়িজল খেয়ে বাইরে যায়। প্রথমে বাতকর্ম। পরে ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে চায়ের দোকান নাম ধরে ডাকবে ওকে।

সদানন্দ ভাড়া থাকে। অর্থাৎ বাপের সঙ্গে শেষব্দিও মেলানো গেল না। মনে হয় জন্ম থেকেই এরা খিঁচড়ে ছিল। সদানন্দের সুখের নাম কী? কী কৌতুক আর কী যে কান্না!

আমার গত এক হপ্তা ধরে নখ দাড়ি বাড়ছে না

হাঃ বলে কী, ডাক্তার দেখা

এটা রোগ নয়, স্থায়ী মানবজন্ম

গাছ নড়চড়ে উঠলো বাতাসের খেয়ালে। কখনো ইংরেজি, হিন্দি কিংবা কখনো বাংলায় সদানন্দ কথা বলে। এইখানে মাঠ। তাতে ঝাঁকড়া এই এক বটগাছ। তাঁর নীচে সদানন্দের বিকেল হয়।

আজকাল আর তেমন ডিম দেখা যায় না, যার কুসুম এই অস্তের সূর্য। বটগাছের কোনো ভাষা নেই। সদার সান্ধ্য ঠিকানা। তারপর ছেলে পড়াতে যাবে। পথে কোনো এক ফকিরের দরগা আছে। সদানন্দ মোম চুরি করে এবং ঘরে এসে বাল্ব নিভিয়ে মোম জ্বালে।

দৈনিক কাগজ, কম্পিটেটিভ পরীক্ষা দেবার বই। একটা টেবিল লাইট হাত দিলে শক্‌ করে, এই হল টেবিল। কিছুদিন পরেই চাকরির পরীক্ষায় বসা যাবে না। বয়স সীমা ছাড়িয়ে যাবে। তবু দিন হয় দিন আর রাত হয় রাত।

এক পেট জল স্বাভাবিক। কখনো ভাত লঙ্কা আলুসেদ্ধ হলে হলে ঢেঁকুর ওঠে। সদা হাঁটতে থাকে। দরোজায় লাগানোর তালা ছিল। তার চাবি নিরুদ্দেশ।
রাস্তার সব ইট উড়তে থাকে, সব সুরকি, জোনাকি।
সদানন্দ রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব কোন দেশের লোক?

 ইজিপ্ট, না... না... হ্যাঁ ইজিপ্ট।
Mr. Sadananda, do you know the story of genesis in the Bible? How man came on earth as per the Bible? Do you agree that man was created by God?

কী জানি! পা কাঁপে আমার। পেটের ভেতর কোঁৎ করে শব্দ হয়। খাইনি কিছু।

বরং একটি জন্মের কথা ধরা যাক। সদা একদা সমুদ্র দেখেছিল। তার বাঁ পাশে মা আর ডান দিকে বাবা। সামনে যতদূর চোখ যায় এ কী! কিসের সামনে দাঁড়ালাম! মা তারপর কী? সন্ধ্যা হচ্ছে, মা আর বাবাকে অনেক দূর হেঁটে যেতে দ্যাখে সদানন্দ।

সদা ঘরে ফিরে আসে। ঘড়ি বারো পেরিয়ে গিয়েছে। এই রাতে যাবার জায়গা বলে এক পায়খানা। বিড়ি দেশলাইও যায়। অযথা বিড়ি টানে। গর্তের মুখে সিমেন্টের স্ল্যাব। এই হল পায়খানা। নীচে জলের মধ্যে শব্দ হয়। কাতারে কাতারে মশা আর আরশোলা বেরিয়ে স্ল্যাবের মুখ দিয়ে। আজগের খবরের কাগজ মনে করে সদানন্দ। আজ একটি কিশোরকে পাওয়া গেছে একটি ডোবার জলে। তার নাকে রক্তের দাগ। পচে গন্ধ।
Q.11. Polyandry means
সদা পায়খানা থেকে বেরিয়ে আসে।

দুই.


ঘরের কোনে ফিতে ছিঁড়ে যাওয়া হাওয়াই, এক পাটি আরেক পাটির সঙ্গে হাসছে। আজও সকাল হয়েছিল। সন্ধ্যা হয়েছিল। আর রাস্তা থেকে চটি হাতে ফিরে আসে সদানন্দ। ছেলে পড়ানো হয় না। ঘরে এসে গভীর রাতের জন্য অপেক্ষা করা হল। বাইরে থেকে বেড়ার একটু তার ছিঁড়ে এনেছে সদা। কিছু কিছু মানুষ সব কাজ গভীর রাতের জন্য রেখে দেয়। তার দিয়ে ছেঁড়া ফিতে জোড়া লাগালে চটির হাসি বন্ধ হল। পা গলিয়ে ঘরেই একটু হেঁটে নেয়, তারপর বিছানায় যায় সে। বিছানা হল তার টাইম মেশিন। ওটাতে করে অতীতে যাওয়াটাই সদানন্দের পছন্দ।

সদানন্দ ভেবে দেখেছে যৌবন আসার আগে সকলে মৃতই থাকে। কারণ, একজন যুবকই ভাবতে পারে, বড়লোকের ডোবারম্যান যেমন, আমাদের ঘরের ছেলেরাও তা। ঘেউ। কাকে ঘেউ? কেন? তবু ঘেউ।

তথাপি একটি নদীর কাছে যাতায়াত। গোপনে আমি আছি তোমার হয়ে। তোমার জাতের নই, তাতে কী? ওই চোখের কী জাত? প্রতিদিন একটি করে চিঠি লেখা। স্বপ্নের রং কখনো নীল কখনো ঘোর স্কারলেট। বাড়িটার নাম হবে বৃষ্টি। সামনের দেয়ালে আমিই এঁকে দোব ছবি। সদর দরোজা থেকে দুধারের সার বাঁধানো দেবদারু। হাওয়ায় এরা দুলবে আরামে। ঘরের রং হবে  চাপা সবুজ। আমাদের শোবার ঘর হাল্কা নীল। আমাদের মনে থাকবে আমাদের বাস। মায়ের ঘরের সঙ্গে ঠাকুর বাবার ঘরে আস্ত লাইব্রেরি। তোমাকে নিয়ে যাব প্রতিদিন এক নদীর কাছে।

কিন্তু সব চুল ছেড়ে দিলে নারীকে কেমন মনে হয়? প্রশ্নের সাথে সাথেই সদানন্দের মনে হয় সমস্ত ঘরটা ঝুপ করে শব্দ করল। সদা টাইম মেশিনে উবু হয়ে শোয়।

টাইম মেশিন। অতীতকাল। সব চুল ছেড়ে দিলে নারীকে কেমন দেখায়? তার চুলে লাগানোর গার্ডার কোথায়? রানিমাসি দাঁড়িয়ে আছে সোজা। তার শাড়ি হল হাওয়ার প্রতীক। সদানন্দ দূর মাঠ ধরে ছুটে আসছে। তার কানে কোনও ডাক এসে পৌঁছায় না

তোর নাম টা বিচ্ছিরি। এ নামে আমি ডাকব না।

সদানন্দ নিজের নাম পাল্টে ফেলে মনে মনে। প্রকাশ্যে পারে না। সকলের তো সব হয় না। নিঝুম হয়ে সদা রানিমাসির পায়ের কাছে বসে। তার নখ থেকে খুটে খুটে রং তুলে নেয়।

ঘরের মেঝেতে খপ করে একটা টিকটিকি পড়ল। সদা পাশ ফিরে তাকে দেখে। সঙ্গে সঙ্গে পাশের বাড়িতে ক্যাবল টিভির শীৎকার কানে আসে। আবার টাইম মেশিন।

রানিমাসি সদাকে কোলে তুলে ঘরে নিয়ে আসে। ঘর মানে সুযোগ। সন্ধ্যা মানে রানিমাসি পেছন ফিরে কাপড় তোলে। টেবিলে কনুই রেখে দাঁড়ায়। সদানন্দকে পেছন থেকে টেনে নেয় অদ্ভুত কায়দায়। এবার একটা ডোবারম্যান ঘোঁত ঘোঁত করে। সব শিথিল করে তারপর বাতাস আসে। অ্যাতোক্ষণ এইসব কোথায় ছিল? এই ঘর, এই হাওয়া? আলো জ্বলে। ঘেউ ঘেউ। পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে সদানন্দ দেয়, মাসি,

আমাকে বৌদি ডাকলি না কেন, প্রথম থেকে? কী রে?

প্রতি সন্ধ্যায়, নিয়মিত যে, প্রতিটি সন্ধ্যায় এইভাবে সদানন্দ একটি ডোবারম্যানকে ভালো করে বুঝে উঠতে পারে না। কার চিঠি কাকে দিয়ে ফেলে! অথচ সদার কাছে একটি নদীও ছিল।

সদা আপনমনে চলে আসে এক শহরে। একপ্রান্তে তার ঘর অন্যদিকে দুনিয়া। কাঁহাসে কাঁহা পহুঁচ গয়া! বাইরে এক জ্যোৎস্না। সদা আকাশের দিকে মুখ তুললে সারারাত ঊর্ধ্বদৃষ্টি কাটিয়ে দেবে। গাছের আনাচে কানাচে তাই জ্যোৎস্না দেখে, আকাশে তাকায় না। কে কাক, ডাকছ? কাকে? রাতকে তোমার দিন মনে হয়?

শহরের বড় বড় বাড়িতে এখন কিছু লোক জাগছে। সদানন্দ আদের চেনে। খবরের কাগজ চেনে। এ সপ্তাহে সদা মোট ১০ জন মানুষের মৃত্যু জেনেছে। এখন রাস্তায় বলে বলে বিক্রি করে কিছু ছেলে। গৃহবধূ ধর্ষিতা, শ্বশুর গ্রেপ্তার। তছলামারায় সাত ব্যক্তি খুন। ওই লোকগুলোর কাছে রাত্রি এক রকম। কাউয়া কা। আমার কাছে এক। কাউয়া কা। সদা এদিক ওদিক হাঁটে। এদিকে ঘাস আছে ওদিকে উঠোন। সদানন্দের পায়ে হাওয়াই চটি। সদ্য লাগানো লোহার সরু তার ব্যথা দিচ্ছে খুব। ঘরে চলে এসো। আসার আগে সদা আকাশে তাকায়। চাঁদ, তুমি নীল আর্মস্ট্রংকে চেন?

বিছানা।

   মাসি, স্কুলে তুমি কী পড়াও?
মাসি স্নানঘর থেকে এসেছে। একটু গায়ে থাক তুই, মাসি অমন করে

   ভালোওওবাসা

   চুল খুলে দাও। আমি গন্ধ নেব। দেবও। আসলে সদা জমিয়ে রাখা থুতু মাখায় চুলে।

বিড়ি দেশলাই। সদা রাত কাটাতে যায়। পায়খানার দরোজায় একটা ব্যাঙ। ওকে দেখে লাফাতে লাফাতে নিরাপদ অন্ধকারে চলে যায়। আজকের কাগজে যে বউটির কথা, তার শ্বশুরের সাথে স্বামীও জড়িত ছিল।

তিন.

Q.5. where are days and nights equal throughout the year and why?

জানি না তো, আহা, সমান?

এই তার শেষ বছর। আর কোনও পরীক্ষা দেওয়া যাবে না। চাকরির আশা হত হল। সদা চারদিকে তাকায়। মেয়েটির চশমাটা টেবিলে উলটো হয়ে মেয়েটিকে দেখছে। তার কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। ওই ছেলেটি বাচ্চা। জানালাগুলো এদিকেরটা ওদিকেরটাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বাতাস খাচ্ছে। ওই মেয়েটির চুল ছেলেদের মত ছাঁটা। একটি ছেলে রোগা, আর এটি হয় ধামসা। ধুর।সদা বেরিয়ে যায়। দরোজা কানে কানে বলে, এসো এসো, দুগগা দুগগা। মহিলাদের কলেজে ছিল পরীক্ষা। সদা সেটি ছেড়ে এসে এখন রাস্তায়।

বাহ, আহা, আর সংবাদপত্র দরকার নেই। কম্পিটিশন সাকসেস পড়ার প্রয়োজন নেই। পরীক্ষা নেই। এখন আমি যেমন খুশি। রাস্তায় এখানে ওখানে গর্তে জল জমে আছে। সদা পেরিয়ে পেরিয়ে হাঁটছে সেদিক দিয়ে। এমন একটা সময় ছিল আমরা ওকে ছবি আঁকতে দেখেছি। এমনও দিন গেছে সে ম্যান্ডোলিন বাজাত। সদা এমন ভাবে দাঁড়াতে জানত, দেখলে মনে হত দেবে যাচ্ছে মাটি। এখন, এখন হাঁটতে হাঁটতে শিস বাজাচ্ছে, সুর নেই তাতে।

শহরে এক যে ছিল রাজা। তার প্রাসাদ এখনও আছে। পতাকা পাল্টে গেছে। প্রাসাদের সামনে রাজপুকুর। মাঝে রাস্তা দুপাশে দুটি।  এক পাশে টুপ করে বসে পড়ে সদা। পকেটে কটি টাকা আছে। সেগুলোকে  ঘাসের ওপর কলমচাপা দিয়ে কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে নিল। পাড়ে উঠে পোক্ত করে বসেছে, যতক্ষণ না জামা কাপড় শুকিয়ে যায়।

কোথাও কিছুক্ষণ বসে থাকার যো নেই। ভিজে কাপড়ে খুব জোর সি পেয়েছে। পেছনে রাস্তা, সামনে পুকুর। কোথায় যাব, আড়াল নেই। খুব জোর। সদা দাঁড়াতে দেরী কর্মটি হয়ে যেতে দেরী হয় না। আমাদের স্থায়ী মানবজন্ম নিজগাত্রে প্রস্রাব করে এবার নাইতে নেমেছে। একবার সাঁতার শিখলে কেউ তা আর ভোলে না।

আমাদের বাড়ির সামনে একটি পুকুর ছিল। সদানন্দ ডুব দিয়ে পুকুরকে একটা গল্প বলে। আমাদের বাড়ির সামনে একটি পুকুর ছিল। তোমার মতন বড় কিন্তু নয়। তবে অনেকে সাঁতার কাটতে আসত। যেমন ধরো, বিনু, রাধে, বিলাস। আমারও কপাল থেকে চাঁদের টিপ মুছে গিয়েছিল। তারপর একদিন পুকুরে চাঁদের বিম্ব হল। আমি দেখলাম। আমার শরীরে বিদ্যুৎ এসে খেলা করে যায়। কেমন মায়া লাগে। রানিমাসি যে, মাসি এ কথা বুঝতে পেরেছিল। আমাকে ডাকত। কেমন মন্ত্রের মতন কাজ। আমি যাই। মাসি তার দুধ খুলে খেতে দেয়। অনেক চুষতাম । দুধ নেই। অন্য বুকে মাসির ছোট ছেলেটা দুধ খেত। কী জানি দুধ আসত কি না। রানিমাসির বাড়িতে একটা রাক্ষসও ছিল। সেলফিশ জায়েন্ট। তার হয়ে মাসি রক্ত শুকিয়ে তারপর গুঁড়ো করে কপালে লাগিয়ে রাখত। নইলে রাক্ষস রাতেরবেলা তাকে পিষে ফেলতে চায়। মাসির অনেক কষ্ট। তাই রাক্ষসকে দেখিয়ে দেখিয়ে সে আমাকে আহ্লাদ করত। সন্ধ্যায় নিজে পুকুর হয়ে আমাকে বলত, সাঁতার কাট। এত কথা একসাথে বলে সদানন্দের জলের নীচে শ্বাস আটকে আসে। ওপরে উঠে এলে ভেসে ওঠে রাস্তা, মানুষ, রাজপ্রাসাদ। হিহি, ধ্যুত, আমি না খুব মিথ্যে বলি। রাজপুকুরকে বলে। আমি একটা ল্যাজকাটা ডোবারম্যান। হি। ঘেউ ঘেউ। পুকুরের খুব মায়া হয়। বলে, সন্ধ্যা হল, বাড়ি যাও।

শহরের সব রাস্তাকে ঘুরেফিরে সদানন্দের বাড়ির পথের কাছে আসতে হয়। ওদিকে হাসপাতাল আছে। হাসপাতালে রাত হয় অন্ধকার। ওই হাসপাতাল ছাড়া এ শহরে আর কোনও গণিকাপল্লী নেই। সদানন্দ যেকোনও একটি পথে হাঁটে। একটি চকচকে ভ্যানিটি ব্যাগ হঠাৎ পথের কোন্‌ থেকে ডাক দেয়। ও কাছে যায়, কলম আর টাকা রয়ে গেছে পুকুরের পাড়ে। পেছন ফেরে না, বরং আরও কাছে যায়। যেতেই মুচকি মুচকি হাসে ব্যাগটি। সদাও হাসে। এদিক ওদিক তাকিয়ে নজর করে দেখে ব্যাগটিকে। দেখে কী, ও এখন মুখ কালো করে তাকিয়ে আছে। পড়ে থাকা ব্যাগ দেখলে পুলিশে খবর দিন। ওই, ওই। মাথায় আতস। পালা, পালা। দৌড়। শ্বাস। আহা আহা। হা হা। কানে কোনও শব্দ বেজে ওঠে না। তবু সে ছুটছে। তার ঘরটিও ছুটছিল তার দিকে। নাহয়, এ পথ সদা এল কী করে ইশারায়?

আজ রোববার। বাড়িঅলা অন্য জায়গা থেকে ফিরে আসে। এই যা। আজ সদারও ছুটি। এই তো স্টোভের সামনে  ঘরের ভেতর। ইনিয়ে বিনিয়ে বলে, আজ জ্বল ভাই, কাল থেকে অত জ্বলতে হবে না। স্টোভও না পারতে জ্বলছে। তার কী দোষ। সদা ভাবে, এসবের মানে কী? আমি কেমন করে হাঁটতে পারি। ঠান্ডা ঘরে ঢুকে অবলীলায় বলতে পারি, গুড মর্নিং স্যার। ফিরে আসার সময়, এনি মোর কোশ্চেন,প্লিজ? না, কোনও প্রশ্ন তো থাকে না। হিহি করে হেসে ওঠে একটা বাটি। সদা সেটাকে তুলে নিয়ে তাল বাজায়। দূরে টেবিলে সকল কাগজপত্র নাচতে থাকে। সংবাদপত্র, খুন, ধর্ষণ নাচে, নাচে উগ্রপন্থী নাচে। সম্পাদক নাচে। নাচে প্রতিদিন নাচে, নাচে কারেন্ট অ্যাফেয়ারস নাচে। সদার পায়ের ঠিক নেই। চুপ। চিড়চিড় স্টোভ জ্বলছে। একটা অদ্ভুত আলো ঘরের ভেতর। বিদ্যুতের আলো কখন চলে গেছে। একটি একটি করে সব কাগজ সদা স্টোভের ওপর ছুঁড়ে মারে। সব, খবরের কাগজ, লেখার কাগজ, কম্পিটিশন সাকসেস। সারটিফিকেটস। অনেক কাগজের নীচে পড়ে বোধহয় সদার স্টোভ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিল। নাহলে দাউ দাউ আগুন জ্বলল না কেন?

চার.

হাসপাতালের কিছু গন্ধ পোষ্টবক্সটির ভেতরেও ঢুকে আছে। তবু এ নিয়েও লাল ডাকবাক্স ঠায় সেঁটে থাকে দেয়ালে। যে লোকটি এগিয়ে আসে, তাকে দেখলেই বোঝা যায় তার একটি বাড়ি আছে, ভাড়া খাটে। চিঠিখানি বাক্সে পড়ে শব্দ করল। লোকটা খানিক তাকাল বাক্সের দিকে। তারপর চলে যায়।

সদার দিনের বেলা পিঁপড়ে আর রাতের বেলা আরশোলা। সারা দিনরাত ঘরে থাকে সে। টিকটিকিদের তার বিশ্বাস নেই। শহরের টিকটিকি মিছেকথায় তিন ডাক ডাকে।

মাঝে মাঝে কাঁদে সদানন্দ। মাঝে মাঝে চেয়ে থাকে। হাসি পেলে থামে না। প্রথমে চেয়ে থাকে, যেমন এখন,  স্থির, যেন সত্যিই দেখতে পাচ্ছে উড়ে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে কাক, চড়ুই, শালিক। ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে কান।

আবার নীরবতায় হাহা করে চারদিক। বনপায়রা এসেছে মরতে। মাথা গুঁজে মরে আছে অনেক পাখি। গম খেতে এসেছিল তারা। সিরাজ মিয়াঁ  ক্ষেতে ওষুধ দিয়েছিল। সদানন্দ এর পেছনে ছুটে যায়, ওর পেছনে যায়। সন্ধ্যা হল এভাবে। সদা অনেক পাখির শব কুড়িয়ে এনেছে। গর্ত খুঁড়েছে। অনেক বড়। সবাইকে সেটাতে মাটি দিল। রাত হয়ে গেছে। গম ক্ষেত অন্ধকার। একটা কড়া গন্ধ হচ্ছে বাতাসে। সদার মাথায় রক্ত উঠে যায়। বাড়ি হতে নিয়ে আসে একটা দেশলাই, কেরোসিন। গম ক্ষেত জ্বলে ওঠে দাউদাউ।

ধরতে পারে ওরা, ধরতে পারে। বাবা গো মেরো না। সদা যেন স্পষ্ট ব্যথা পায় এখনও। অশরীরী হয়ে বাবা তাকে এখনো মারছেন। এইসব দেখে কেঁদে ওঠে সদানন্দ। সে জানে না একটা ডাকবাক্সও আজ তার জন্য কেঁদেছে। নীল একটা ইনল্যান্ড লেটার পড়ে নিয়েছিল সেই ডাকবাক্স।

আপনাদের পুত্র শ্রীমান্‌ সদানন্দের আচরণে একপ্রকার সন্দেহ হইতেছে ।তাহার চুলে জটা ধরিয়াছে এবং চোখেও অদ্ভুত দৃষ্টি আসিয়াছে ।কাহারো সহিত কথা বলে না।নিজে নিজেই হাসিয়া এবং কাঁদিয়া উঠে ।মাসখানেক ধরিয়া স্নান খাওয়া প্রায় বন্ধ করিয়া দিয়াছে ।আপনারা আসিয়া একবার দেখিয়া যাইবেন ।অন্যথায় আপনাদের পুত্রের এই দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পারিবনা ক্ষমা করিবেন ।

ডাকবাক্সের কষ্ট হয়েছিলো ।সদারও কত খাম সে দেখেছিলো ।বায়োডাটা, ব্যাঙ্কড্রাফট,বয়েসের মানপত্র, সার্টিফিকেটসের জেরক্স, কয়েকখানা সদ্য তোলা ছবি।সদা তো আর অপরিচিত কেউ নয় ।

 

পাঁচ

মার সঙ্গে বাবাও এসেছিল ।মাথায় হাত রাখে বাবা, মনে হয় মাথা ফুঁড়ে সমস্ত অভিমান আজ বেরিয়ে যাবে ।এমন হয়না ।শুধু কৌতুক, না-কি সদা এমন হাসা হাসলো, এত লজ্জা এ্যাতো কাঁদলো ।

এদিকে আমাদের শহরে মৃদু ভূমিকম্প হয়েছে একদিন ।অনেকের বিয়ে হয়ে গেলো।রাতের বেলা আকাশ দিয়ে এরোপ্লেন যায় ।শীত পড়লো খুব ।আমরা তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে আসতাম ।

অনেকদিন সদাকে আমরা মনে রাখলাম না ।আমাদের অনেক বাইরে যে সদা অনেকগুলো বছর কাটিয়ে দিয়ে আসে, তারও কেবল তিনজনকে মনে আছে ।আজ ফিরে আসার পর তাদেরকে মনে করে না সে। তবু তার মনে আছে ।সদা এখন ভাবে তিনজন বলতে একজন মহিলা, জান্‌লায় দাঁড়িয়ে থাকে সারাদিন ।বিকেল হলে কাঁদে আর কাকে যেন টাটা দ্যায় ।তার বয়েসী একটি ছেলে সারাদিন ধ্যানে বসে থাকে ।ধ্যানেই তাকে জোড় করে খাওয়াতে হয় ।ধ্যানেই তার সবকিছু ।আর ওই ডাক্তার ।টাক হলে মানুষের চেহারা যেমন গম্ভীর হ্য়, তারও তেমন ।এমন একটি লোকই সদাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলো,

Do you know who Jocasta was?

   রানি মাসি ।

এ প্রথম ফিরে আসার পর সদা বেশি করে হেসে ওঠে ।

 

তার ঘর ।সব ঠিকই পায় সে ।সারাদিন আড্ডা মারতে ইচ্ছে করে এত ঝরঝরে হয়েছে সদা ।তবে কারো কথা জিজ্ঞেস করলোনা ।সন্ধ্যায় আমরা দুজন নদীর পাড়ে অনেক পাখির ডাক শুনলাম ।ওর প্রিয় ব্র্যাণ্ডের সিগারেট খেলাম ।আরো ধীরে সন্ধ্যা কালো হয় ।সদাকে বাড়ি দিয়ে আসা ঠিক হবে ।

 

আজও ও আলো নিভিয়ে দ্যায় ।মোম নিয়ে পুরোনো ছবিগুলিকে দেখলো ।একটু একটু হাসলো ।ড্রয়ার থেকে অনেকগুলি পুরোনো চিঠি বের করে আনে ।টেবিলের সাম্নে বসে ।

 

চেয়ারটাকে নাড়িয়ে চাড়িয়ে আগের আরাম পর্যন্ত যায় ।একটি বই নিয়ে শব্দ করে পড়েহুঁ হুঁ সমস্ত বেগই আপেক্ষিক বেগ ।কারণ পৃথিবীতে প্রকৃত স্থির বলিয়া কোন বস্তু

হেসে ওঠে ।পড়ার সুরটাও বেশ মনে আছে ।মোম জ্বেলে দেয়ার পরই ওকে ভালো করে চোখে পড়ে ।তবু এতক্ষণ না দেখার ভান করেছে ।এবার হাত দিলে তার শব্দও আগের মতো খসখসে ।আজকের কাগজ-ই তো ! সদা প্রথমে হেডলাইন দেখে ।দুলাইন সম্পাদকীয় পড়ে ।এ পাতা ও পাতা ।বিজ্ঞাপন ।রোববারের আলাদা পাতা ।না, নাই-তো ।আগের মতো নাই-তো ।ওসব এম্নিতেই চোখে পড়ে অত দেখতে হয়না ।তবু দেখে সদা ।বাইরে আকাশে আজও  জ্যোৎস্না ।ওঘরে একটু টিভি দেখে আসা হলো ।আবার, খস খস ।না-নাই ।ধর্ষণ, খুন, হত্যা ।নাই ।অন্য, অন্য রকম সবকিছু ।মোমের কাছে অনেক পোকা আসে ।সদা তাদেরকেও ভালো মতো দ্যাখে ।তাদের ডানার রঙ জলের মতো ।বারবার আগুনে লেগে যাচ্ছে কই পুড়ছে না তো ।এবার স্যুইচ টেপে সদা ।আঙুল দিয়ে কলামের ওপর থেকে নীচ অব্দি আসে।না।স্যুইচ অফ্।আবার মোম জ্বালে ।কাগজটি বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে ফিক্‌ ফিক্‌ হাসে ।

 

রাত্রি নীরব হয়ে ওঠে ।খেয়ে আসার পর ।বিছানার দিকে যেতে ভয় করে সদার।কাগজটা আছে। তবু হাতে নিয়ে চোখের সাম্নে ধরে রাখে ।দ্যাখে না ছাই-ও।

রানিমাসি এখানে নেই ।রক্তও না ।মাসিকে অপারেশন করে নারীর কম করা হয়েছিলো মনে আছে ।মাসিও মুটিয়ে গ্যাছিলো ।তার যেন যন্ত্রণাই কমে গ্যাছিলো অনেক ।সব যন্ত্রণা কি ঐ অপারেশনে কেটে গিয়েছে? কাগজটিকে ফেলে রাখে সদা।বাবাও এখন আর ততো রাগী নয় ।

 

মোম নিভে গেলে ঘরের মধ্যে সব অন্ধকার ।বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে ।

 

মা চা না দিলে সদা ঘুম থেকে ওঠেনা ।বাইরে থেকে ডাকলে উঠে গিয়ে চা নেয় ।কুঁজো থেকে জল নিয়ে মুখ ধোয় ।আজও কুঁজো ঘরের কোনে, মায়ের বাঁ পায়ের শব্দ ডান পায়ের চেয়ে বেশি হয় ।কুঁজো তা শোনে আর ভয় পায় ।আস্তে দু তিনবার মা ডাকে ।দরোজা খোলে না ।কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ঠেলা দ্যায় ।ভেজানোই ছিলো ।খুলে গেলে একরাশ আলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে মেঝের মাঝখানে উল্টে রাখা চেয়ারে ।হাত থেকে কাপ প্লেট প্রথম শব্দগুলি করে, তারপর মা ।দরোজার এক পাটে হেলান দিয়ে মা স্থির হয়ে যায় ।বুকের কাছে এসে যায় চিবুক ।চোখ বন্ধ ।নীরব ।ঘরের কোন্‌ থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে জলের কুঁজো ।মায়ের পায়ের কাছে এসে কাত হয়ে জল দিতে থাকে ।তার ভেতর সমুদ্র ছিলো, ভেসে যাচ্ছে গতকালের কাগজ ।The king is dead, long live the king. সমুদ্রের সকল ঢেউ মেঝের সামান্য ওপরে সদানন্দের পা-ও স্পর্শ করে ।   

[প্রকাশিত : পদক্ষেপ, ১৪০১]


পাঠের জন্য ধন্যবাদ। এই অতিমারির কালে গাছের সঙ্গে সময় দারুণ কাটে 

               

 


৫টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ বললেও কম বলা হবে কাকু, খুব ভালো লাগলো!

    উত্তর দিনমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. অশোক আপনি বহু আগেই কয়েকটা ব্রহ্মস্ত্র মেরে রেখেছেন ! এটি তেমন । জিও উস্তাদ

      মুছুন
  2. খুব ভালো লাগলো।

    অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

    উত্তর দিনমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. পাঠের জন্য ধন্যবাদ। মন্তব্য করলেন। ভালো লাগল।

      মুছুন