গদ্য অথবা গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গদ্য অথবা গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

মনভুম

 




মনভূম
অশোক দেব

 

বাজারের ব্যাগে করে টাকা! লোকটা কী অদ্ভুত আর নির্বিকার। সাদা চেক চেক লুঙ্গি। পাঞ্জাবির বুক খোলা, সাদা, চঞ্চল রোমরাজি, একটা ফিনফিনে কিন্তু ভারি হার। সোনার। কোলের ওপরে ব্যাগটা। নিতান্ত সাধারণ বাজার করবার ব্যাগ। মিহি ফাঁকগুলো দিয়ে দেখা যাচ্ছে লাল লাল নোট। বাণ্ডিল, বাণ্ডিল।সব দুহাজারের নোট! ব্যাগের ওপর বাম হাতটি রাখা। হাতের রোম আবার কালো। আঙুলে একটা কী জানি কিসের আঙটি। বুকে ঝোলানো চশমা, দুলছে। সোনার ফ্রেম হবে। লোকটা মাড়ওয়ারি? না-ও হতে পারে। লুঙ্গি পরা তো। ব্যবসায়ী? টাকা কোনো ব্যাপার না? কিছুতেই ওর দিকে তাকানো যাবে না। তাকানো যাবে না ওই টাকার দিকেও।নিজেকে বলে অনি। কিন্তু এ তো নাক ডাকছে। পোষা ভুঁড়িটা শ্বাসের সঙ্গে ফুলছে। চুপসে যাচ্ছে। ফুলে উঠবার সময় সোজা ফুলে ওঠে। দুমড়ে যাবার সময় দুবার কাঁপে।

ওদিকে জানালা। এ বাসটা এসি। এখনও কয়েকটা চলে।আগরতলা-গৌহাটি। ট্রেনে যাওয়া যেত। অনি গেল না।বাসই ওর জন্য ঠিক, ভেবেছে ও। জানালার কাচটা ফিক্সড। আগের মতন নামিয়ে বাইরের বাতাস নেওয়া যায় না এই বাসে। পর্দা লাগানো। অত দামি বাস, অথচ পর্দাগুলো বাংলাবাজারের। অনি এটাকে একটু তুলে দিল। আবার পড়ে যায়। হাতে লাগছে। কাপড়টাতে শীত মেশানো, তবুও এর একটা নিজস্ব উত্তাপ আছে। সেটাই হাতে লাগছে। একসময়  একটু সরিয়ে জানালার বাইরে তাকানো গেল। অচেনা সব গাছপালা,বাড়িঘর নেই। রাস্তাটা দারুণ মসৃণ। দূরে মাঠ। লোকে কাজ সেরে ফিরে যাচ্ছে। একটা পাওয়ার টিলারকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে একটা কাদামাখা মানুষ। দূরে। কিন্তু গাড়িটা অত ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে কেন? সাঁই সাঁই করে পেছনে চলে যাচ্ছে গাছপালা

সন্ধ্যা হল। কেমন একটা মায়াবী আলো জ্বলেছে। বাইরে ঘোর অন্ধকার। এখন পাহাড়ি রাস্তা। জানালার কাচের গায়ে বিন্দু বিন্দু জল। ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। লোকটা উঠে গিয়ে আবার ফিরেছে। ওই ব্যাগটা সিটে রেখেই গিয়েছিল। একটু আগে যে এক জায়গায় দাঁড়ালো, তখনই কেবল ওই ব্যাগ নিয়ে নেমেছিল। আরেকটা ব্যাগের মধ্যে এই ব্যাগটাকে ঢুকিয়ে নিয়েছিল তখন। কিন্তু থলেটাকে নিল এমনভাবে যেন, বাজার থেকে মাছটাছ কিনে ফিরছে। এখানে একটু চা খাওয়া হল। হাল্কা রুটি আর মটরের ডাল। অনি বহুদিন পর সিগারেট খেয়েছে। লোকটা হাসিমুখে অফার করল। নীরবে। অনিও হাসল।পকেটে হাত দিয়ে দেশলাইটা ছুঁতেই ওর মুখের সামনে একটা টুংটাং আওয়াজ। বেশ সুরেলা।লোকটা লাইটার এগিয়ে দিল। কত দামি হবে এটা? বিদেশি? লোকটা চোখ দিয়ে বলল সিগারেট ধরিয়ে নিতে। অনি ধরাল। আজকে ঠিকই করেছিল কোথাও বসে একটা সিগারেট খাবে। তাই পকেটে দেশলাই নিয়েছিল। কতদিন সিগারেট খায় না। যাক,এই লোকের বদান্যে কিনতে হল না। এখন আবার ঘুমোচ্ছে, আবার সেই নাকডাকা। কোলে ব্যাগ। এখনও সাদা আরেকটা ব্যাগের মধ্যে ঢোকানোই রয়েছে।

কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে এসেছে অনিন্দ্য। গৃহত্যাগ। সোজা হিমালয়। পকেটে কিছু টাকা আর কার্ডস। আর ভালো লাগে না এই খিটিমিটি। পাঁচ বছর হয়ে গেল বিয়ের। আজ বিবাহবার্ষিকী। আজই গাড়ি কিনতে হবে। গত ছমাস ধরে এই এক চাপ। বাড়িঘর কিছু করেনি অনি।বাবার আমলের বাড়িটাই ঠিকঠাক করে আছে, বেশ। নেই গ্যারাজ, নেই প্রশস্ত রাস্তা।সরু গলির ভেতরে একতলা পুরনো বাড়ি।তাতে  আবার গাড়ি? বিবাহবার্ষিকী এলেই প্রতিবছর কতকত টাকা বেরিয়ে যায়। পরীক্ষার পর পরীক্ষা দিয়ে অনিন্দ্য আজ এই জায়গায় এসেছে। ব্যাঙ্কে খাটতেও তার ভালো লাগে। চাইলেই দারুণ একটা বাড়ি করতে পারে। গাড়ি কিনতে পারে। কিছুই করেনি অনি।  সে কৃষক হতে চায়। স্বপ্ন দেখে। সন্তানের প্ল্যানও করল না তাই। কেবল জমি কিনছে। কিনে কিনে বাড়িয়ে চলেছে। আজকাল খালি জমি পাওয়া কঠিন। পুরোটা রাজ্যেই রাবার গাছ।সবাই রাবারের বন তৈরি করছে। এই জমিটা বিশাল। মালিক বাংলাদেশী। এখানে একজন আত্মীয়ার নামে কেনা। তিনি থাকেন কলকাতায়। প্রতিবার একটু করে জমি কেনে অনি। আর ওই মহিলার বায়নাক্কা সহ্য করে। আসা যাওয়ার প্লেনভাড়া, হোটেল, উপহার অনি সহ্য করে। এই হল একটা টিলা। দক্ষিণ দিকটা খোলা। অনেকদূর অব্দি খোলা। অনি ছুটি পেলেই এখানে আসে। মাটির একটা ঘর বানানো হয়েছে। তাতে সব সুবিধা। দক্ষিণে গোল করে একটা পুকুর করেছে। পুকুর কাটায় উঠে আসা মাটিকে নানারকম ট্রিটমেন্ট করা হল। সিজন করা হল ঘর বানাতে। এই ঘর এখনও এদিকের লোকজন বানাতে শেখেনি কেউ। রুরাল ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করে একটা এনজিও আছে।  গৌহাটি বেসড। ওদের কন্ট্রাক্ট দিয়েছিল অনি। ওরা এসে করে দিল। এর চেয়ে ইট কংক্রিটের করলে হয়তো খরচ কম পড়ত ।অনি মাটির ঘরই চেয়েছে। আর কী খাসা বানিয়েছে এরা। শীতে গরম, গরমে ঠান্ডা। আর কেমন একটা গন্ধ। গৃহপূজার দিনে স্বাতীকে এনেছিল,অনেক সাধ্যসাধনা করে। স্বাতী এসবকে পাগলামিই মনে করে। গোবরের তাল, গোহাল, পুকুরের হাঁস সবেতেই তার ঘেন্না লাগে। অথচ ঘরটির বারান্দায় ঝোলানো চেয়ারে বসে যখন দূর দক্ষিণের দিকে তাকায়, অনি কী যেন দেখতে পায়।একটা স্বপ্নকে বড়ো হতে দেখে। পার্মাকালচার করবে সে। একটা অরণ্য নির্মাণ করবে। জগতের যত পোকা, পিঁপড়ে, সাপ, প্রজাপতি সবার জন্য একটু একটু আবাস করে দেবে।বেঁচে থাকতে হলে যা যা দরকার, কিছুই কিনবে না। বাঁচাটাকে কেবল জীবনের প্রাচুর্যে ভরিয়ে তুলবে। অন্য আর কি প্রাচুর্য চাই? এরা কী সুন্দর ডিজাইন করে দিয়ে গেল।চুক্তিটাই এমন। সতীশ দত্ত নামে এক অসমীয়া যুবক এনজিওটার চেয়ারম্যান। ছেলেটা শিল্পী। কেবল স্বপ্ন দেখে। কাজের সময়ে কিছুর অভাব রাখে না। চাঁদ দেখার জন্য, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখবার জন্যও ছোটো ছোটো ঢিবি তৈরি করেছে। সবগুলোতেই আলাদা আলাদা কাঠের পাটাতন, চেয়ার বাহারি টেবিল। এখানে এলে অনিন্দ্য কেমন হয়ে যায়।নিজেকে মানুষ মনেহয়।বাকি সময়টাতে মনেহয় যন্ত্র। এখানে এলেই সে আপনি গুনগুন করে। আর নারুদের পরিবারটাও দারুণ। এরা কত খাটতে পারে, আর কী বিশ্বস্ত। নারুর বউটা খুব ভালো রান্না করতে জানে।এককালের সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবার এরা। আশির দাঙ্গায় সর্বস্বান্ত হয়েছে। এখন এখানে থাকে। এরাই এইসব দেখেটেখে রাখে। যারা কাজ করে তাদের পাওনাগণ্ডা লিখে রাখে। অনিন্দ্য এলে দেখায়।বেশ আনন্দে আছে এরা এখানে।আনন্দই এদের মাসোহারা। অনেক চেয়েও একটি টাকা দিতে পারেনি অনিন্দ্য। যতটা হয়েছে এই কৃষিপৃথিবী, তাতেই এদের চলে যায়, কিছুই কিনতে হয় না।কেবল রান্নার তেলটুকু।আর জেনারেটরের ডিজেল অনিন্দ্যই নিয়ে আসে। কিন্তু ও না এলে এরা সেটা চালায় না। হ্যারিকেন দিয়েই চালিয়ে নেয়। আজকাল অনিন্দ্যও হ্যারিকেনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। কী সুন্দর আলো। যতটা চাই, ততটাই, আলোর অপচয় নেই।

এইসব ভাবতে ভাবতে যেন একটু ঘুমঘুম লাগল। তড়াক করে সে দেখে নেয় ছোটো স্লিং ব্যাগটা।মনভূম সে নারুদাকে দিয়ে যাবে।নারুদা ছাড়া কে আর পারবে একে রক্ষা করতে? ছোটোবেলা থেকে এদের কোলেপিঠেই মানুষ হয়েছে সে। উর্বর মাটির মতন গায়ের রং, উজ্জ্বল ফসলের মতন চেহারা। এরাই অনির স্বপ্নকে বয়ে নিতে পারবে। বলবার আগেই নারুদা আর তার বন্ধ্যা স্ত্রী বুঝে ফেলে, কী চাইছে অনি। সবকিছু অত সুন্দর করে সাজায়।এইখানে কী সুন্দর লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন করে কারা? কারা প্রতিটি গাছকে এক-এক করে চেনে? এদের কাছে দেবে না তো, কাকে দেওয়া যাবে? দানসংক্রান্ত সব পেপার্স এই ব্যাগটাতে। আর এটা সে দেবে ওই এনজিও-র সঙ্গে চুক্তি করে। কাজ থামানো যাবে না।প্রজেক্ট শেষ করবার সবটা টাকাই এদের দিয়ে যাবে। আর যতটা পেনশন আসবে, তাতে ওর হয়ে যাবে। স্বাতীকেও পাঠানো যাবে। সে অন্যকিছু করে ফেললে? করুকগে। বিয়েই তো করবে, আর গাড়িবাড়ি এসব। শুধু মনভূমের জন্য মন পুড়বে, বুঝতে পারে অনি।ব্যাঙ্কও মনে পড়বে। হঠাৎ স্বেচ্ছা অবসরের চিঠি পেয়ে ব্যাঙ্ক অবাক। কতবার ফোন এল। এমনকি হেড অফিস থেকে ই-মেল এল।  এসব আর এখন ভাবতে চায় না।তখন সারাদিন মনভূম নিয়েই ভাবত সে,কী নাম দেওয়া যায় এই অরণ্যের? অনেক অনেক নিদ্রাহীন রাত কাটিয়েছে সেই ভেবে। সতীশ একটা সাইন তৈরি করে দিয়েছিল।কাঠের। খালি রেখে গিয়েছিল। নাম ঠিক করে নিয়ে তাতে লিখবার জন্য। সেই প্রিয় মাটির ঘরে শুয়েই নামটা মনে এল একদিন। এখন তো কৃষি, পার্মাকালচার ছাড়া কিছু পড়ে না। আর খালি এ সংক্রান্ত ভিডিও দেখে নেট খুঁজে খুঁজে। কী একটা পড়তে গিয়ে মানভূম শব্দটা এল।সেটা একটা জায়গার নাম।তাকে একটু পালটেই এই মনভূম।

ঘুমঘুম ভাব। কিন্তু ঘুম আসছে না। একটু নির্ভার লাগছে বটে, কিন্তু মন শান্ত হচ্ছে না।

  কিছু দেবে না এবার?

  কোনবার দিই না?

  সোজা করে কথা বলতে পারো না?

  সরি, কী দিতে হবে বল

  টয়োটা ফর্চুনা

  সে আবার কী?

  ওই দেখ, গাড়ি আরকি। কী সুন্দর পুরুষালী, মাসকুলার

  গাড়িরও মাসল?

  সে তুমি বুঝবে না

  হুম

  কী হুম?

  কত?

  বেসিকটা আঠাশ আর সুপারটা চৌত্রিশ।

লাফ দিয়ে উঠে বসে অনি, চৌত্রিশ লাখ’?

  আমার জন্য যেটা রেখেছিলে, সেটা ম্যাচিউর করেছে। তুলে এনেছি। দশ ওখানে হয়ে যাবে। বাকিটা ফিনান্স করিয়ে নেবে। একটু একটু করে ইএমআই ।

  মানে? লোন নিতে বলছ?

  সবাই তা করে, পুরো টাকা দিয়ে গাড়ি কে কেনে?

  টাকাটা তুলে নিয়ে চলে এলে?

  সেটা তো আমার

  তোমার? তো, তাতেই তো একটা গাড়ি হয়ে যায়। চৌত্রিশ কেন? আর আমি তো ওই টাকা রেখেছিলাম, মনভূমে একটা গোটারি করব বলে।

  এই তো চাষার ছেলে বেরিয়ে এল। গরুছাগল ছাড়া মাথায় কিছু থাকে না।আসেও না। সারাক্ষণ গায়ে ওসবের গন্ধ।

চুপ হয়ে যায় অনি। এই খোঁটাটা খেতে খেতে সত্যিই রোগগ্রস্ত হয়ে গেল সে। কতরকমের এসেন্স, কত বডি স্প্রে, স্নানের জলে মেশানোর সুগন্ধি যে সে কেনে। বস এলে, কাস্টমার এলে, কোনো মহিলার কাছাকাছি গেলে নিজের নাকে নিজের গন্ধ পায়। কুঁকড়ে যায় ভেতর থেকে। সবচেয়ে অসুবিধে হয় মিটিঙের সময়।

ধীরে উঠে চলে যায় এখন। স্টাডিতে চলে আসে। বসে থাকে। একটু হুইস্কি বানিয়ে খায়। মাথা ভোঁ ভোঁ করে।

এঘরেই উঠে এল স্বাতী

  আমি সবাইকে বলে দিয়েছি। আর ওদের সেলসেও কথা বলেছি।কালকে একজন আসবে। কী কী লাগবে সব নিয়ে যাবে। গুছিয়ে রেখো। কালই যেন দিয়ে দেওয়া যায়। ওরাই সবটা প্রসেস করবে।

  আই হেট লোন। তুমি জান, কত লোক সর্বস্বান্ত হয়ে যায় শখের জন্য ঋণ করে? হয় দশের মধ্যে কোনো গাড়ি কিনে ফেল, নাহয় ওই টাকা আমাকে দাও। গোটারিটা দরকার।

  মানে? ছাগল হল নেসেসিটি আর গাড়ি শখ? থাকো তুমি ছাগল নিয়ে, সকালেই আমি যাচ্ছি।

আরেকটু মদ খেয়ে নেয় অনি, আচ্ছা

  হোয়াট ডু ইয়ু মিন, আচ্ছা?

  যেও

ধুপধাপ করে বেরিয়ে যায় স্বাতী। কী যেন ভাঙছে। কাচের কিছু হবে। ইস পা কাটবে কাটুকগে। আজ আর যায় না ও-ঘরে।এসব দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে অনি। বরং একটা স্প্রে বের করে সারা শরীরে মেখে নেয়। মাথা ঝিমঝিম। তার মধ্যেই সিদ্ধান্ত পাকা করে ফেলে। চলে যাবে সে।

মুখটা তেতো লাগছে। এখন রাত। বাসের বাতি জ্বলেছে। খুব খেটে খেটে যাচ্ছে বাসটা। রাস্তা খুবই খারাপ। মাঝে মাঝে অবশ্য স্পিডও দিচ্ছে। লোকটা ঘুমোচ্ছে, নাক ডাকছে। এভাবে যাচ্ছে কেন বাসটা? যেন উড়ছে। সকলে ঘুমোচ্ছে আর বাস যেন উড়ছে। এক মুহূর্ত পরেই বুঝে ফেলে অনি, গাড়িটা পড়ে যাচ্ছে। কত গভীর খাদ কে জানে। চোখ বন্ধ করে রাখে সে। সবাই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করছে।আর্ত। লোকটা ঘুমোচ্ছে পাশে। দুবার ঠেলল, আর তখুনি হুড়মুড় করে গাড়িটা মাটিতে পড়ল। অন্ধকার হয়ে গেল সব।

কী অন্ধকার, কী অন্ধকার! বাইরে বৃষ্টির ছাঁট এসে চোখেমুখে লাগছে। কেউ কি বেঁচে আছে? নিজেকে হাতড়ে দেখে অনি। কিছুই হল না তার? এমনকি চশমাটাও অক্ষত, মোবাইলটাও ঠিকঠাক। জ্বালে সেটাকে। কী বীভৎসভাবে পড়ে আছে লোকটা, টাকার ব্যাগটা সিটে। সেখানেই তার একটা পা। বাকি শরীরটা কেমন বেঁকিয়ে গিয়ে সামনের সিটের হেলানের ওপরে রক্ত রক্ত কী করবে ভাবতেই মাথাটা ঘুরে গেল অনির। তড়াক করে টাকার ব্যাগটা হাতে নেয়। লাথি মেরে মেরে জানালার কাচ ভেঙেই ফেলে। কিন্তু বেরোতে পারছে না। কোনওমতে শরীরের ওপরটা বের করে আনে অনি। বাইরে থেকে কে যেন খুব জোরে টান দেয় ওর দুহাত ধরে। বেরিয়ে আসে সে। সামনে সেই বামনটা।

একটা মাঝবয়সী মানুষ। তিনফুট হবে? কিন্তু ওর শরীরে অত শক্তি? অনিকে বের করে বামনটা সেই টাকাওয়ালা লোকের শরীর ধরে টানাটানি করছে। সারাক্ষণ ওই লোকটার সঙ্গেই ছিল। খাবার সময়েও।জল এনে দিচ্ছে। একটু খইনি ডলে দিচ্ছে। সে ছিল আইলের অন্যদিকের সিটে, ওদের পাশেই। এখন কী করা যায়? ভিজে একসা হয়ে গেছে। মোবাইলটা নিভিয়ে দেয়। হাতে টাকার ব্যাগ। অনি একটা অন্ধকারের দিকেই হাঁটতে শুরু করে দিল।

কী একটা লেগেছে পায়ে, চিনচিন করছে। কিন্তু তেমন কিছু নয়। অনি হেঁটেই চলেছে। বৃষ্টি হচ্ছে অবিরাম। কত লোক মরে গেল? কত যেন ব্যথায় কাতরাচ্ছে। কাউকে ফোন করা যায়? ফোন বার করে। আলো। কিন্তু টাওয়ার নেই। ফোন পকেটে রাখতে গিয়েই আবার দেখল ওই সাদা পোশাকের বামনটাকে। নীরবে পিছু নিয়েছে সে। টাকার ব্যাগটা আরও শক্ত করে ধরে অনি। হাঁটে। বামনের কি পায়ের শব্দ হয় না? অত নিঃশব্দে সারাটা পথ ফলো করে আসছে? এখন তো প্রায় দুমিটার দূরত্ব রেখে হেঁটে চলেছে। কিছু বলছেও না। কেবল ফলো করছে। পেচ্ছাপ পায় অনির। সারা শরীর ভেজা। বৃষ্টিও। অনি দাঁড়ায় না। হাল্কা করে দেয় নিজেকে। পা বেয়ে নেমে যাচ্ছে জল। হাঁটা বন্ধ করে না।

কতটা হেঁটেছে ওরা? বামনটা সামনে আসে না। কিছু বলেও না, নীরবে আসছে। একটা সাদা রং আছে পেছনে। বোঝা যাচ্ছে। অনি পেছনে না তাকিয়েও দেখতে পায়। ও কি ভাগ চাইবে টাকার? নাকি ওর কোমরে গোঁজা আছে পিস্তল? ওরা কোনো গ্যাঙের নয় তো? অনি ভাবে না। সে কেবল অন্ধকারে একটা পেশল গাড়িকে দেখতে পায়। সকাল হলেই ফিরে যাবে। সব টাকা স্বাতীর কাছে দিয়ে চিরকালের জন্য মনভূমে। একটা ডিভোর্সের ছোটো মামলা করতে হবে খালি। কিন্তু এমন দুর্বল লাগছে কেন? আর প্রস্রাবও থামছে না। অত জল কোথা হতে এল শরীরে? বৃষ্টি বলে? অনি ফোনটা জ্বালে। দেখে। জল নয় বেরিয়ে যাচ্ছে রক্ত। কোনো ব্যথা নেই, কিছু নেই। কেবল অনর্গল রক্ত বয়ে চলেছে। এই জায়গাটা সমতল। একটা টিলার ওপরে। অনি বসে, ক্লান্তি বেড়ে যায় অনেক। কেমন তেষ্টা পাচ্ছে। টাকার ব্যাগটা পাশে মাটিতে রেখে মাটিতেই বসে পড়ে।ছোটো ছোটো উলুখাগড়া।খোঁচা লাগল। গা করে না।একটু দূরে ওই সাদা বামনটাও বসেছে।নাকি শুয়ে পড়ল? নাকি ঠাস করে পড়ে গেল মাটিতে? মাথা ঝিমঝিম করছে। টাকাগুলো ভিজে গেল? কিন্তু এটা ঠিক কেমন অনুভূতি? অজ্ঞান হয়ে যাবে? কেমন শীত লাগছে তার। একটু জল আর উত্তাপ চাই। কেউ কি নেই কোথাও? বামনটাকে বললে রক্ত বন্ধ করতে পারবে? সবগুলো টাকা দিয়ে দিলে করে দেবে না? কিন্তু ও কেন এমন করে শুয়ে পড়ল? মরে গেল না তো? দূর দূর কোথাও কোনো আলো নেই। এটা কি আসামের জঙ্গল নাকি মেঘালয়ে? কেমন যেন একটা বমি ভাব। নিজের লিঙ্গটিকে চেপে ধরে অনি। একটা পেশল গাড়ি, একটা নিজের গড়া অরণ্য, একটা সুন্দর সম্পন্ন কৃষিজীবন সব ঘোলাটে হয়ে যায়। এ রক্ত থামবার নয়?  কী যেন মনে হতে পকেটে হাত দেয় অনি। দেশলাইটা বার করে। সবটা ভেজেনি, তবে অনেকটাই ভিজেছে। সাদা একটা টাকাভর্তি ব্যাগ, একটু দূরে সাদা একটা বেঁটে লোক আর পায়ের পথ ধরে গলগল রক্ত।গাড়িটা পড়ার সময় কোথায় লেগেছিল? তলপেটে নাকি ওইখানে? এখন আর কিছু ভাবতেই পারছে না। কেমন যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে সব। তবু, অনি চেষ্টা করে একবার দুবার জ্বলল। হাতের আড়াল করে সাদা ব্যাগটাতে আগুনটা ছোঁয়ায়। ব্যাগটা প্লাস্টিকের। প্রথমে জ্বলতে চায়নি। কয়েকবারের চেষ্টায় জ্বলে উঠল। বৃষ্টিও এখন কম। কেবল রক্তটাই বন্ধ হচ্ছে না। ঘুম আসছে, ঘুম।

 প্রকাশিত: মায়াজম, উৎসব সংখ্যা ২০২০ 

বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২০

ডোবারম্যান



অশোক দেব

ডোবারম্যান


এক

শুয়ে অন্ধকারে চোখ মেলে থাকাটাই ঘুম। সদানন্দের নিদ্রা। চোখের সাম্নে নানা রঙের বলয় তৈরি হতে থাকে। কখন ভোর হবে ভাবতে ভাবতে ভোর হয়। পাখি ডাকে, ঠিক তখন কিচ্ছু না জানিয়ে সদার ঘুম আসে।

সদানন্দ স্বপ্ন দ্যাখে। দ্যাখে, একটি ঘর, মেঝে একদম তকতকে, মন্দির যেমন। ছাদ থেকে ঘণ্টার মতো ঝুলছে অসংখ্য রাবারের তৈরি পুরুষাঙ্গ। দুলছে। কখনো, কোনো কোনো সময় এসবকে আসল বলে মনে হয়। গা বেয়ে রক্তও ঝরতে দেখা যায়। মেঝের মাঝখানে শুকনো রক্তের আলপনা। তাতে বসে আছে রানী মাসি পদ্মাসনে। নগ্ন, টান টান। চোখ আধবোজা। পুরো ঘরটার একটা উলটো ছবি মেঝের মধ্যে বিম্ব। সদানন্দ ঘুম ভেঙে তড়াক করে উঠে বসে।

ভয়ে ভয়ে নিজেকে একবার আঁতিপাঁতি খুঁজে দেখে স্বপ্নটাকে ভুলে যায়।
এসব আবার আরেকজন জানে কীভাবে? জানি, কারণ, সদা এমন একজন যে, অনেক সময় সে শুধু ঠোঁট নাড়ে, কথাগুলো বলে দিই আমি। সিনেমায় যেমন গান হয়।

সকাল হল। সবকিছু ওপাশে রেখে বেজে ওঠে নটার সাইরেন। ওয়াটার সাপ্লাইয়ের কল তিনবার হেঁচকি তুলে জল দেয়া বন্ধ করল প্রায়। খড়ধোয়া। অফিস টান দিল হ্যাঁচকা টানে পায়খানার লাইন। কোথাও জাগল হরতাল। কাশ্মীর জাগল। পাঞ্জাব জাগল। খবরের কাগজ জেগে ওঠে আর সদানন্দ বিড়ির কৌটোকে ডাকে। দেশলাই ডাকে। কাঁথায় পিঁচুটি মোছে, বিড়িজল খেয়ে বাইরে যায়। প্রথমে বাতকর্ম। পরে ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে চায়ের দোকান নাম ধরে ডাকবে ওকে।

সদানন্দ ভাড়া থাকে। অর্থাৎ বাপের সঙ্গে শেষব্দিও মেলানো গেল না। মনে হয় জন্ম থেকেই এরা খিঁচড়ে ছিল। সদানন্দের সুখের নাম কী? কী কৌতুক আর কী যে কান্না!

আমার গত এক হপ্তা ধরে নখ দাড়ি বাড়ছে না

হাঃ বলে কী, ডাক্তার দেখা

এটা রোগ নয়, স্থায়ী মানবজন্ম

গাছ নড়চড়ে উঠলো বাতাসের খেয়ালে। কখনো ইংরেজি, হিন্দি কিংবা কখনো বাংলায় সদানন্দ কথা বলে। এইখানে মাঠ। তাতে ঝাঁকড়া এই এক বটগাছ। তাঁর নীচে সদানন্দের বিকেল হয়।

আজকাল আর তেমন ডিম দেখা যায় না, যার কুসুম এই অস্তের সূর্য। বটগাছের কোনো ভাষা নেই। সদার সান্ধ্য ঠিকানা। তারপর ছেলে পড়াতে যাবে। পথে কোনো এক ফকিরের দরগা আছে। সদানন্দ মোম চুরি করে এবং ঘরে এসে বাল্ব নিভিয়ে মোম জ্বালে।

দৈনিক কাগজ, কম্পিটেটিভ পরীক্ষা দেবার বই। একটা টেবিল লাইট হাত দিলে শক্‌ করে, এই হল টেবিল। কিছুদিন পরেই চাকরির পরীক্ষায় বসা যাবে না। বয়স সীমা ছাড়িয়ে যাবে। তবু দিন হয় দিন আর রাত হয় রাত।

এক পেট জল স্বাভাবিক। কখনো ভাত লঙ্কা আলুসেদ্ধ হলে হলে ঢেঁকুর ওঠে। সদা হাঁটতে থাকে। দরোজায় লাগানোর তালা ছিল। তার চাবি নিরুদ্দেশ।
রাস্তার সব ইট উড়তে থাকে, সব সুরকি, জোনাকি।
সদানন্দ রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব কোন দেশের লোক?

 ইজিপ্ট, না... না... হ্যাঁ ইজিপ্ট।
Mr. Sadananda, do you know the story of genesis in the Bible? How man came on earth as per the Bible? Do you agree that man was created by God?

কী জানি! পা কাঁপে আমার। পেটের ভেতর কোঁৎ করে শব্দ হয়। খাইনি কিছু।

বরং একটি জন্মের কথা ধরা যাক। সদা একদা সমুদ্র দেখেছিল। তার বাঁ পাশে মা আর ডান দিকে বাবা। সামনে যতদূর চোখ যায় এ কী! কিসের সামনে দাঁড়ালাম! মা তারপর কী? সন্ধ্যা হচ্ছে, মা আর বাবাকে অনেক দূর হেঁটে যেতে দ্যাখে সদানন্দ।

সদা ঘরে ফিরে আসে। ঘড়ি বারো পেরিয়ে গিয়েছে। এই রাতে যাবার জায়গা বলে এক পায়খানা। বিড়ি দেশলাইও যায়। অযথা বিড়ি টানে। গর্তের মুখে সিমেন্টের স্ল্যাব। এই হল পায়খানা। নীচে জলের মধ্যে শব্দ হয়। কাতারে কাতারে মশা আর আরশোলা বেরিয়ে স্ল্যাবের মুখ দিয়ে। আজগের খবরের কাগজ মনে করে সদানন্দ। আজ একটি কিশোরকে পাওয়া গেছে একটি ডোবার জলে। তার নাকে রক্তের দাগ। পচে গন্ধ।
Q.11. Polyandry means
সদা পায়খানা থেকে বেরিয়ে আসে।

দুই.


ঘরের কোনে ফিতে ছিঁড়ে যাওয়া হাওয়াই, এক পাটি আরেক পাটির সঙ্গে হাসছে। আজও সকাল হয়েছিল। সন্ধ্যা হয়েছিল। আর রাস্তা থেকে চটি হাতে ফিরে আসে সদানন্দ। ছেলে পড়ানো হয় না। ঘরে এসে গভীর রাতের জন্য অপেক্ষা করা হল। বাইরে থেকে বেড়ার একটু তার ছিঁড়ে এনেছে সদা। কিছু কিছু মানুষ সব কাজ গভীর রাতের জন্য রেখে দেয়। তার দিয়ে ছেঁড়া ফিতে জোড়া লাগালে চটির হাসি বন্ধ হল। পা গলিয়ে ঘরেই একটু হেঁটে নেয়, তারপর বিছানায় যায় সে। বিছানা হল তার টাইম মেশিন। ওটাতে করে অতীতে যাওয়াটাই সদানন্দের পছন্দ।

সদানন্দ ভেবে দেখেছে যৌবন আসার আগে সকলে মৃতই থাকে। কারণ, একজন যুবকই ভাবতে পারে, বড়লোকের ডোবারম্যান যেমন, আমাদের ঘরের ছেলেরাও তা। ঘেউ। কাকে ঘেউ? কেন? তবু ঘেউ।

তথাপি একটি নদীর কাছে যাতায়াত। গোপনে আমি আছি তোমার হয়ে। তোমার জাতের নই, তাতে কী? ওই চোখের কী জাত? প্রতিদিন একটি করে চিঠি লেখা। স্বপ্নের রং কখনো নীল কখনো ঘোর স্কারলেট। বাড়িটার নাম হবে বৃষ্টি। সামনের দেয়ালে আমিই এঁকে দোব ছবি। সদর দরোজা থেকে দুধারের সার বাঁধানো দেবদারু। হাওয়ায় এরা দুলবে আরামে। ঘরের রং হবে  চাপা সবুজ। আমাদের শোবার ঘর হাল্কা নীল। আমাদের মনে থাকবে আমাদের বাস। মায়ের ঘরের সঙ্গে ঠাকুর বাবার ঘরে আস্ত লাইব্রেরি। তোমাকে নিয়ে যাব প্রতিদিন এক নদীর কাছে।

কিন্তু সব চুল ছেড়ে দিলে নারীকে কেমন মনে হয়? প্রশ্নের সাথে সাথেই সদানন্দের মনে হয় সমস্ত ঘরটা ঝুপ করে শব্দ করল। সদা টাইম মেশিনে উবু হয়ে শোয়।

টাইম মেশিন। অতীতকাল। সব চুল ছেড়ে দিলে নারীকে কেমন দেখায়? তার চুলে লাগানোর গার্ডার কোথায়? রানিমাসি দাঁড়িয়ে আছে সোজা। তার শাড়ি হল হাওয়ার প্রতীক। সদানন্দ দূর মাঠ ধরে ছুটে আসছে। তার কানে কোনও ডাক এসে পৌঁছায় না

তোর নাম টা বিচ্ছিরি। এ নামে আমি ডাকব না।

সদানন্দ নিজের নাম পাল্টে ফেলে মনে মনে। প্রকাশ্যে পারে না। সকলের তো সব হয় না। নিঝুম হয়ে সদা রানিমাসির পায়ের কাছে বসে। তার নখ থেকে খুটে খুটে রং তুলে নেয়।

ঘরের মেঝেতে খপ করে একটা টিকটিকি পড়ল। সদা পাশ ফিরে তাকে দেখে। সঙ্গে সঙ্গে পাশের বাড়িতে ক্যাবল টিভির শীৎকার কানে আসে। আবার টাইম মেশিন।

রানিমাসি সদাকে কোলে তুলে ঘরে নিয়ে আসে। ঘর মানে সুযোগ। সন্ধ্যা মানে রানিমাসি পেছন ফিরে কাপড় তোলে। টেবিলে কনুই রেখে দাঁড়ায়। সদানন্দকে পেছন থেকে টেনে নেয় অদ্ভুত কায়দায়। এবার একটা ডোবারম্যান ঘোঁত ঘোঁত করে। সব শিথিল করে তারপর বাতাস আসে। অ্যাতোক্ষণ এইসব কোথায় ছিল? এই ঘর, এই হাওয়া? আলো জ্বলে। ঘেউ ঘেউ। পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে সদানন্দ দেয়, মাসি,

আমাকে বৌদি ডাকলি না কেন, প্রথম থেকে? কী রে?

প্রতি সন্ধ্যায়, নিয়মিত যে, প্রতিটি সন্ধ্যায় এইভাবে সদানন্দ একটি ডোবারম্যানকে ভালো করে বুঝে উঠতে পারে না। কার চিঠি কাকে দিয়ে ফেলে! অথচ সদার কাছে একটি নদীও ছিল।

সদা আপনমনে চলে আসে এক শহরে। একপ্রান্তে তার ঘর অন্যদিকে দুনিয়া। কাঁহাসে কাঁহা পহুঁচ গয়া! বাইরে এক জ্যোৎস্না। সদা আকাশের দিকে মুখ তুললে সারারাত ঊর্ধ্বদৃষ্টি কাটিয়ে দেবে। গাছের আনাচে কানাচে তাই জ্যোৎস্না দেখে, আকাশে তাকায় না। কে কাক, ডাকছ? কাকে? রাতকে তোমার দিন মনে হয়?

শহরের বড় বড় বাড়িতে এখন কিছু লোক জাগছে। সদানন্দ আদের চেনে। খবরের কাগজ চেনে। এ সপ্তাহে সদা মোট ১০ জন মানুষের মৃত্যু জেনেছে। এখন রাস্তায় বলে বলে বিক্রি করে কিছু ছেলে। গৃহবধূ ধর্ষিতা, শ্বশুর গ্রেপ্তার। তছলামারায় সাত ব্যক্তি খুন। ওই লোকগুলোর কাছে রাত্রি এক রকম। কাউয়া কা। আমার কাছে এক। কাউয়া কা। সদা এদিক ওদিক হাঁটে। এদিকে ঘাস আছে ওদিকে উঠোন। সদানন্দের পায়ে হাওয়াই চটি। সদ্য লাগানো লোহার সরু তার ব্যথা দিচ্ছে খুব। ঘরে চলে এসো। আসার আগে সদা আকাশে তাকায়। চাঁদ, তুমি নীল আর্মস্ট্রংকে চেন?

বিছানা।

   মাসি, স্কুলে তুমি কী পড়াও?
মাসি স্নানঘর থেকে এসেছে। একটু গায়ে থাক তুই, মাসি অমন করে

   ভালোওওবাসা

   চুল খুলে দাও। আমি গন্ধ নেব। দেবও। আসলে সদা জমিয়ে রাখা থুতু মাখায় চুলে।

বিড়ি দেশলাই। সদা রাত কাটাতে যায়। পায়খানার দরোজায় একটা ব্যাঙ। ওকে দেখে লাফাতে লাফাতে নিরাপদ অন্ধকারে চলে যায়। আজকের কাগজে যে বউটির কথা, তার শ্বশুরের সাথে স্বামীও জড়িত ছিল।

তিন.

Q.5. where are days and nights equal throughout the year and why?

জানি না তো, আহা, সমান?

এই তার শেষ বছর। আর কোনও পরীক্ষা দেওয়া যাবে না। চাকরির আশা হত হল। সদা চারদিকে তাকায়। মেয়েটির চশমাটা টেবিলে উলটো হয়ে মেয়েটিকে দেখছে। তার কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। ওই ছেলেটি বাচ্চা। জানালাগুলো এদিকেরটা ওদিকেরটাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বাতাস খাচ্ছে। ওই মেয়েটির চুল ছেলেদের মত ছাঁটা। একটি ছেলে রোগা, আর এটি হয় ধামসা। ধুর।সদা বেরিয়ে যায়। দরোজা কানে কানে বলে, এসো এসো, দুগগা দুগগা। মহিলাদের কলেজে ছিল পরীক্ষা। সদা সেটি ছেড়ে এসে এখন রাস্তায়।

বাহ, আহা, আর সংবাদপত্র দরকার নেই। কম্পিটিশন সাকসেস পড়ার প্রয়োজন নেই। পরীক্ষা নেই। এখন আমি যেমন খুশি। রাস্তায় এখানে ওখানে গর্তে জল জমে আছে। সদা পেরিয়ে পেরিয়ে হাঁটছে সেদিক দিয়ে। এমন একটা সময় ছিল আমরা ওকে ছবি আঁকতে দেখেছি। এমনও দিন গেছে সে ম্যান্ডোলিন বাজাত। সদা এমন ভাবে দাঁড়াতে জানত, দেখলে মনে হত দেবে যাচ্ছে মাটি। এখন, এখন হাঁটতে হাঁটতে শিস বাজাচ্ছে, সুর নেই তাতে।

শহরে এক যে ছিল রাজা। তার প্রাসাদ এখনও আছে। পতাকা পাল্টে গেছে। প্রাসাদের সামনে রাজপুকুর। মাঝে রাস্তা দুপাশে দুটি।  এক পাশে টুপ করে বসে পড়ে সদা। পকেটে কটি টাকা আছে। সেগুলোকে  ঘাসের ওপর কলমচাপা দিয়ে কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে নিল। পাড়ে উঠে পোক্ত করে বসেছে, যতক্ষণ না জামা কাপড় শুকিয়ে যায়।

কোথাও কিছুক্ষণ বসে থাকার যো নেই। ভিজে কাপড়ে খুব জোর সি পেয়েছে। পেছনে রাস্তা, সামনে পুকুর। কোথায় যাব, আড়াল নেই। খুব জোর। সদা দাঁড়াতে দেরী কর্মটি হয়ে যেতে দেরী হয় না। আমাদের স্থায়ী মানবজন্ম নিজগাত্রে প্রস্রাব করে এবার নাইতে নেমেছে। একবার সাঁতার শিখলে কেউ তা আর ভোলে না।

আমাদের বাড়ির সামনে একটি পুকুর ছিল। সদানন্দ ডুব দিয়ে পুকুরকে একটা গল্প বলে। আমাদের বাড়ির সামনে একটি পুকুর ছিল। তোমার মতন বড় কিন্তু নয়। তবে অনেকে সাঁতার কাটতে আসত। যেমন ধরো, বিনু, রাধে, বিলাস। আমারও কপাল থেকে চাঁদের টিপ মুছে গিয়েছিল। তারপর একদিন পুকুরে চাঁদের বিম্ব হল। আমি দেখলাম। আমার শরীরে বিদ্যুৎ এসে খেলা করে যায়। কেমন মায়া লাগে। রানিমাসি যে, মাসি এ কথা বুঝতে পেরেছিল। আমাকে ডাকত। কেমন মন্ত্রের মতন কাজ। আমি যাই। মাসি তার দুধ খুলে খেতে দেয়। অনেক চুষতাম । দুধ নেই। অন্য বুকে মাসির ছোট ছেলেটা দুধ খেত। কী জানি দুধ আসত কি না। রানিমাসির বাড়িতে একটা রাক্ষসও ছিল। সেলফিশ জায়েন্ট। তার হয়ে মাসি রক্ত শুকিয়ে তারপর গুঁড়ো করে কপালে লাগিয়ে রাখত। নইলে রাক্ষস রাতেরবেলা তাকে পিষে ফেলতে চায়। মাসির অনেক কষ্ট। তাই রাক্ষসকে দেখিয়ে দেখিয়ে সে আমাকে আহ্লাদ করত। সন্ধ্যায় নিজে পুকুর হয়ে আমাকে বলত, সাঁতার কাট। এত কথা একসাথে বলে সদানন্দের জলের নীচে শ্বাস আটকে আসে। ওপরে উঠে এলে ভেসে ওঠে রাস্তা, মানুষ, রাজপ্রাসাদ। হিহি, ধ্যুত, আমি না খুব মিথ্যে বলি। রাজপুকুরকে বলে। আমি একটা ল্যাজকাটা ডোবারম্যান। হি। ঘেউ ঘেউ। পুকুরের খুব মায়া হয়। বলে, সন্ধ্যা হল, বাড়ি যাও।

শহরের সব রাস্তাকে ঘুরেফিরে সদানন্দের বাড়ির পথের কাছে আসতে হয়। ওদিকে হাসপাতাল আছে। হাসপাতালে রাত হয় অন্ধকার। ওই হাসপাতাল ছাড়া এ শহরে আর কোনও গণিকাপল্লী নেই। সদানন্দ যেকোনও একটি পথে হাঁটে। একটি চকচকে ভ্যানিটি ব্যাগ হঠাৎ পথের কোন্‌ থেকে ডাক দেয়। ও কাছে যায়, কলম আর টাকা রয়ে গেছে পুকুরের পাড়ে। পেছন ফেরে না, বরং আরও কাছে যায়। যেতেই মুচকি মুচকি হাসে ব্যাগটি। সদাও হাসে। এদিক ওদিক তাকিয়ে নজর করে দেখে ব্যাগটিকে। দেখে কী, ও এখন মুখ কালো করে তাকিয়ে আছে। পড়ে থাকা ব্যাগ দেখলে পুলিশে খবর দিন। ওই, ওই। মাথায় আতস। পালা, পালা। দৌড়। শ্বাস। আহা আহা। হা হা। কানে কোনও শব্দ বেজে ওঠে না। তবু সে ছুটছে। তার ঘরটিও ছুটছিল তার দিকে। নাহয়, এ পথ সদা এল কী করে ইশারায়?

আজ রোববার। বাড়িঅলা অন্য জায়গা থেকে ফিরে আসে। এই যা। আজ সদারও ছুটি। এই তো স্টোভের সামনে  ঘরের ভেতর। ইনিয়ে বিনিয়ে বলে, আজ জ্বল ভাই, কাল থেকে অত জ্বলতে হবে না। স্টোভও না পারতে জ্বলছে। তার কী দোষ। সদা ভাবে, এসবের মানে কী? আমি কেমন করে হাঁটতে পারি। ঠান্ডা ঘরে ঢুকে অবলীলায় বলতে পারি, গুড মর্নিং স্যার। ফিরে আসার সময়, এনি মোর কোশ্চেন,প্লিজ? না, কোনও প্রশ্ন তো থাকে না। হিহি করে হেসে ওঠে একটা বাটি। সদা সেটাকে তুলে নিয়ে তাল বাজায়। দূরে টেবিলে সকল কাগজপত্র নাচতে থাকে। সংবাদপত্র, খুন, ধর্ষণ নাচে, নাচে উগ্রপন্থী নাচে। সম্পাদক নাচে। নাচে প্রতিদিন নাচে, নাচে কারেন্ট অ্যাফেয়ারস নাচে। সদার পায়ের ঠিক নেই। চুপ। চিড়চিড় স্টোভ জ্বলছে। একটা অদ্ভুত আলো ঘরের ভেতর। বিদ্যুতের আলো কখন চলে গেছে। একটি একটি করে সব কাগজ সদা স্টোভের ওপর ছুঁড়ে মারে। সব, খবরের কাগজ, লেখার কাগজ, কম্পিটিশন সাকসেস। সারটিফিকেটস। অনেক কাগজের নীচে পড়ে বোধহয় সদার স্টোভ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিল। নাহলে দাউ দাউ আগুন জ্বলল না কেন?

চার.

হাসপাতালের কিছু গন্ধ পোষ্টবক্সটির ভেতরেও ঢুকে আছে। তবু এ নিয়েও লাল ডাকবাক্স ঠায় সেঁটে থাকে দেয়ালে। যে লোকটি এগিয়ে আসে, তাকে দেখলেই বোঝা যায় তার একটি বাড়ি আছে, ভাড়া খাটে। চিঠিখানি বাক্সে পড়ে শব্দ করল। লোকটা খানিক তাকাল বাক্সের দিকে। তারপর চলে যায়।

সদার দিনের বেলা পিঁপড়ে আর রাতের বেলা আরশোলা। সারা দিনরাত ঘরে থাকে সে। টিকটিকিদের তার বিশ্বাস নেই। শহরের টিকটিকি মিছেকথায় তিন ডাক ডাকে।

মাঝে মাঝে কাঁদে সদানন্দ। মাঝে মাঝে চেয়ে থাকে। হাসি পেলে থামে না। প্রথমে চেয়ে থাকে, যেমন এখন,  স্থির, যেন সত্যিই দেখতে পাচ্ছে উড়ে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে কাক, চড়ুই, শালিক। ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে কান।

আবার নীরবতায় হাহা করে চারদিক। বনপায়রা এসেছে মরতে। মাথা গুঁজে মরে আছে অনেক পাখি। গম খেতে এসেছিল তারা। সিরাজ মিয়াঁ  ক্ষেতে ওষুধ দিয়েছিল। সদানন্দ এর পেছনে ছুটে যায়, ওর পেছনে যায়। সন্ধ্যা হল এভাবে। সদা অনেক পাখির শব কুড়িয়ে এনেছে। গর্ত খুঁড়েছে। অনেক বড়। সবাইকে সেটাতে মাটি দিল। রাত হয়ে গেছে। গম ক্ষেত অন্ধকার। একটা কড়া গন্ধ হচ্ছে বাতাসে। সদার মাথায় রক্ত উঠে যায়। বাড়ি হতে নিয়ে আসে একটা দেশলাই, কেরোসিন। গম ক্ষেত জ্বলে ওঠে দাউদাউ।

ধরতে পারে ওরা, ধরতে পারে। বাবা গো মেরো না। সদা যেন স্পষ্ট ব্যথা পায় এখনও। অশরীরী হয়ে বাবা তাকে এখনো মারছেন। এইসব দেখে কেঁদে ওঠে সদানন্দ। সে জানে না একটা ডাকবাক্সও আজ তার জন্য কেঁদেছে। নীল একটা ইনল্যান্ড লেটার পড়ে নিয়েছিল সেই ডাকবাক্স।

আপনাদের পুত্র শ্রীমান্‌ সদানন্দের আচরণে একপ্রকার সন্দেহ হইতেছে ।তাহার চুলে জটা ধরিয়াছে এবং চোখেও অদ্ভুত দৃষ্টি আসিয়াছে ।কাহারো সহিত কথা বলে না।নিজে নিজেই হাসিয়া এবং কাঁদিয়া উঠে ।মাসখানেক ধরিয়া স্নান খাওয়া প্রায় বন্ধ করিয়া দিয়াছে ।আপনারা আসিয়া একবার দেখিয়া যাইবেন ।অন্যথায় আপনাদের পুত্রের এই দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পারিবনা ক্ষমা করিবেন ।

ডাকবাক্সের কষ্ট হয়েছিলো ।সদারও কত খাম সে দেখেছিলো ।বায়োডাটা, ব্যাঙ্কড্রাফট,বয়েসের মানপত্র, সার্টিফিকেটসের জেরক্স, কয়েকখানা সদ্য তোলা ছবি।সদা তো আর অপরিচিত কেউ নয় ।

 

পাঁচ

মার সঙ্গে বাবাও এসেছিল ।মাথায় হাত রাখে বাবা, মনে হয় মাথা ফুঁড়ে সমস্ত অভিমান আজ বেরিয়ে যাবে ।এমন হয়না ।শুধু কৌতুক, না-কি সদা এমন হাসা হাসলো, এত লজ্জা এ্যাতো কাঁদলো ।

এদিকে আমাদের শহরে মৃদু ভূমিকম্প হয়েছে একদিন ।অনেকের বিয়ে হয়ে গেলো।রাতের বেলা আকাশ দিয়ে এরোপ্লেন যায় ।শীত পড়লো খুব ।আমরা তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে আসতাম ।

অনেকদিন সদাকে আমরা মনে রাখলাম না ।আমাদের অনেক বাইরে যে সদা অনেকগুলো বছর কাটিয়ে দিয়ে আসে, তারও কেবল তিনজনকে মনে আছে ।আজ ফিরে আসার পর তাদেরকে মনে করে না সে। তবু তার মনে আছে ।সদা এখন ভাবে তিনজন বলতে একজন মহিলা, জান্‌লায় দাঁড়িয়ে থাকে সারাদিন ।বিকেল হলে কাঁদে আর কাকে যেন টাটা দ্যায় ।তার বয়েসী একটি ছেলে সারাদিন ধ্যানে বসে থাকে ।ধ্যানেই তাকে জোড় করে খাওয়াতে হয় ।ধ্যানেই তার সবকিছু ।আর ওই ডাক্তার ।টাক হলে মানুষের চেহারা যেমন গম্ভীর হ্য়, তারও তেমন ।এমন একটি লোকই সদাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলো,

Do you know who Jocasta was?

   রানি মাসি ।

এ প্রথম ফিরে আসার পর সদা বেশি করে হেসে ওঠে ।

 

তার ঘর ।সব ঠিকই পায় সে ।সারাদিন আড্ডা মারতে ইচ্ছে করে এত ঝরঝরে হয়েছে সদা ।তবে কারো কথা জিজ্ঞেস করলোনা ।সন্ধ্যায় আমরা দুজন নদীর পাড়ে অনেক পাখির ডাক শুনলাম ।ওর প্রিয় ব্র্যাণ্ডের সিগারেট খেলাম ।আরো ধীরে সন্ধ্যা কালো হয় ।সদাকে বাড়ি দিয়ে আসা ঠিক হবে ।

 

আজও ও আলো নিভিয়ে দ্যায় ।মোম নিয়ে পুরোনো ছবিগুলিকে দেখলো ।একটু একটু হাসলো ।ড্রয়ার থেকে অনেকগুলি পুরোনো চিঠি বের করে আনে ।টেবিলের সাম্নে বসে ।

 

চেয়ারটাকে নাড়িয়ে চাড়িয়ে আগের আরাম পর্যন্ত যায় ।একটি বই নিয়ে শব্দ করে পড়েহুঁ হুঁ সমস্ত বেগই আপেক্ষিক বেগ ।কারণ পৃথিবীতে প্রকৃত স্থির বলিয়া কোন বস্তু

হেসে ওঠে ।পড়ার সুরটাও বেশ মনে আছে ।মোম জ্বেলে দেয়ার পরই ওকে ভালো করে চোখে পড়ে ।তবু এতক্ষণ না দেখার ভান করেছে ।এবার হাত দিলে তার শব্দও আগের মতো খসখসে ।আজকের কাগজ-ই তো ! সদা প্রথমে হেডলাইন দেখে ।দুলাইন সম্পাদকীয় পড়ে ।এ পাতা ও পাতা ।বিজ্ঞাপন ।রোববারের আলাদা পাতা ।না, নাই-তো ।আগের মতো নাই-তো ।ওসব এম্নিতেই চোখে পড়ে অত দেখতে হয়না ।তবু দেখে সদা ।বাইরে আকাশে আজও  জ্যোৎস্না ।ওঘরে একটু টিভি দেখে আসা হলো ।আবার, খস খস ।না-নাই ।ধর্ষণ, খুন, হত্যা ।নাই ।অন্য, অন্য রকম সবকিছু ।মোমের কাছে অনেক পোকা আসে ।সদা তাদেরকেও ভালো মতো দ্যাখে ।তাদের ডানার রঙ জলের মতো ।বারবার আগুনে লেগে যাচ্ছে কই পুড়ছে না তো ।এবার স্যুইচ টেপে সদা ।আঙুল দিয়ে কলামের ওপর থেকে নীচ অব্দি আসে।না।স্যুইচ অফ্।আবার মোম জ্বালে ।কাগজটি বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে ফিক্‌ ফিক্‌ হাসে ।

 

রাত্রি নীরব হয়ে ওঠে ।খেয়ে আসার পর ।বিছানার দিকে যেতে ভয় করে সদার।কাগজটা আছে। তবু হাতে নিয়ে চোখের সাম্নে ধরে রাখে ।দ্যাখে না ছাই-ও।

রানিমাসি এখানে নেই ।রক্তও না ।মাসিকে অপারেশন করে নারীর কম করা হয়েছিলো মনে আছে ।মাসিও মুটিয়ে গ্যাছিলো ।তার যেন যন্ত্রণাই কমে গ্যাছিলো অনেক ।সব যন্ত্রণা কি ঐ অপারেশনে কেটে গিয়েছে? কাগজটিকে ফেলে রাখে সদা।বাবাও এখন আর ততো রাগী নয় ।

 

মোম নিভে গেলে ঘরের মধ্যে সব অন্ধকার ।বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে ।

 

মা চা না দিলে সদা ঘুম থেকে ওঠেনা ।বাইরে থেকে ডাকলে উঠে গিয়ে চা নেয় ।কুঁজো থেকে জল নিয়ে মুখ ধোয় ।আজও কুঁজো ঘরের কোনে, মায়ের বাঁ পায়ের শব্দ ডান পায়ের চেয়ে বেশি হয় ।কুঁজো তা শোনে আর ভয় পায় ।আস্তে দু তিনবার মা ডাকে ।দরোজা খোলে না ।কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ঠেলা দ্যায় ।ভেজানোই ছিলো ।খুলে গেলে একরাশ আলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে মেঝের মাঝখানে উল্টে রাখা চেয়ারে ।হাত থেকে কাপ প্লেট প্রথম শব্দগুলি করে, তারপর মা ।দরোজার এক পাটে হেলান দিয়ে মা স্থির হয়ে যায় ।বুকের কাছে এসে যায় চিবুক ।চোখ বন্ধ ।নীরব ।ঘরের কোন্‌ থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে জলের কুঁজো ।মায়ের পায়ের কাছে এসে কাত হয়ে জল দিতে থাকে ।তার ভেতর সমুদ্র ছিলো, ভেসে যাচ্ছে গতকালের কাগজ ।The king is dead, long live the king. সমুদ্রের সকল ঢেউ মেঝের সামান্য ওপরে সদানন্দের পা-ও স্পর্শ করে ।   

[প্রকাশিত : পদক্ষেপ, ১৪০১]


পাঠের জন্য ধন্যবাদ। এই অতিমারির কালে গাছের সঙ্গে সময় দারুণ কাটে 

               

 


সোমবার, ১৫ জুন, ২০২০

একাকিত্ব — আত্মবিচ্যুত মানুষের রক্তগীতিকা






সেই বৃক্ষের কথা ভাবি। সুখসাগর জলার মাঝখানে সে দাঁড়িয়ে থাকত। ছোটো একটা ডাঙা, সে ছাড়া আর কেউ নেই। বর্ষায় নাচন-নাচন জল তার পদতলে ঢেউ সমর্পণ করে।হেমন্তে কেটে নেওয়া ধানের মস্ত একাকিত্বের মধ্যে সে দাঁড়িয়ে থাকত। দূর হতে দেখতাম। হয়তো পিতার সঙ্গে অভিমান করে অস্থায়ী গৃহত্যাগ করেছি। তখন জাতীয় সড়কের ওপর দিয়ে কেবল নীরবতা যাতায়াত করত। অতসব গাড়িঘোড়া ছিল না। ঘামের গন্ধ ফেলতে ফেলতে চলে যেত সাইকেল চালক কিংবা রিকশাওয়ালা। টুংটাং বেজে চলত ঘণ্টি। ঘণ্টি মাত্রই নিজে বাজে। রিকশায় লাগানো কেরোসিনের বাতিটি আলো কম বিষাদ ছড়াত বেশি। আমি ওই দূরের বটবৃক্ষের কাছে কত কী নালিশ করতাম। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার কারণে সে নিকট হয়ে উঠত। যেন তার পাতার নাচন দেখতে পেতাম। অনেকক্ষণ বসে থাকতাম। অনেকক্ষণ। ধীরে মন শান্ত হয়ে যেত। আকাশের অস্তানুষ্ঠান শুরু হলে দেখতাম রঙের চড়কমেলা। এক রং অন্যকে অভিবাদন করে, আলিঙ্গন করে। নিজেদের একেবারে মিশিয়ে ফেলে অন্ধকার হিসেবে পুনর্জন্ম নেয়। তখন ফিরে আসি। মনের মধ্যে কে যেন গান করে। অপূর্বরচিত, অপূর্বগীত সেই গান আমি নিজেকে শোনাই। অভিমান উবে যায়, আমি আর গান মিলে দুইজন হই, আমি আর একাকী থাকি না।
এই যে প্রাচীন বৃক্ষটি। এই যে আলোকযজ্ঞের আকাশ। এই যে পথিকবিরল পথ। এরা একা? তাহলে আমি কেন এমন একাকী? তবু আমি এমন একাকী। এ দুটি পঙ্‌ক্তি সেই কবির নির্জনতার কবি বলে যার অভিধা জুটেছিল। বাংলা কবিতায় একাকিত্বকে অত করুণ সুরে আর কেউ বাজাননি।
কিন্তু কী এই একাকিত্ব? কী তার পরিচয়? এই একাকিত্ব শব্দটির জন্মই-বা কবে। ইংরেজিতে দেখলাম, loneliness শব্দটির ব্যবহার ১৮০০ সালের আগে বিরল। প্রায় নেই। ১৬০০ সালের আশেপাশে lonely শব্দটিকে দেখা যায়। কিন্তু সেটা আজকের একাকিত্ব নয়। আজকের একাকিত্বকে বলা হচ্ছে একুশ শতকের কুষ্ঠ। অর্থাৎ একটা কঠিন ছোঁয়াচে রোগ। একটা মহামারি, নিজেই। এই করোনাকালে যে একাকিত্বে আমরা বাস করছি, সেই করোনার থেকে বয়সে প্রাচীন এক মহামারি নিয়ে কথা বলতে বসেছি একাকিত্ব। আবার যদি সেই নির্জনতার কবির কাছে যাই? মাথার ভেতরে এক বোধ জন্ম লয়মড়ার খুলির মতন আছাড় মারিতে চাইআমি তারে পারি না এড়াতে। কী সে? এর জবাব কি অনেক পরে আমেরিকা থেকে পাব আমরা? সে আরেক একাকীর কাছ থেকে? সিলভিয়া প্লাথ। করুণ এক কবি। একাকিত্বের মার জীবনভর সইতে সইতে শেষে আত্মহত্যা করলেন। ২০১৭ আর ২০১৮ সালে দুই খণ্ডে তাঁর চিঠিগুলো প্রকাশিত হয়। মায়ের কাছে লেখা, পত্রমিত্রের কাছে লেখা, ধাত্রীর কাছে লেখা এবং মনোচিকিৎসকের কাছে লেখা। সেইসব চিঠির একটিতে বলছেন ‘I am so lonely, this single room is so lonely’. একাকিত্বের বোধ সিলভিয়ার ভাষায়, উঠে আসে ‘from the vague core of the self – like a disease of the blood’. তাহলে এ এক অজানা রোগ? দুজন একাকী মানুষ, একজন ১৯২৯ সালের আশেপাশে যাকে বোধ বলতে চাইছেন, তাঁর থেকে বহু পরে এসে এক আমেরিকান কবি তাকে রোগ বলছেন? তাহলে একাকিত্ব আসলে কী?
১৬০০ সালে রচিত একটি অভিধানে lone শব্দটি আমরা পাই। কিন্তু বাংলা একাকিত্ব শব্দটি হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত বঙ্গীয় শব্দকোষে এখনও নেই। নেই। নেই জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধানেও। কারণ সে ছিল না। যে গাছ দেশে জন্মায় না, তার নাম কী করে রাখবে মানুষ? সংস্কৃতে কৈবল্য আছে কিন্তু সেই শব্দের কেন্দ্র ও পরিধি ভিন্ন। নিঃসঙ্গ শব্দটি কি ছিল না? ছিল না নির্জন? ইংরেজিতেও অনুরূপ অর্থবাহী শব্দ ছিল, বাংলাতেও আছে। সেসবের অর্থ ঠিক একাকিত্ব নয়। নিঃসঙ্গ, নির্জন প্রধানত শারীরিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক। কিন্তু একাকিত্ব মনোশারীরিক, তারপর বাকি সব।
এখন রাত্রিকাল। একটা সবুজ রঙের আলো আছে বাইরে। আগামীকাল পূর্ণিমা। মেঘের রঙের সঙ্গে চাঁদের জোছনা মিশে শ্যামল হয়েছে। বারান্দায় বসে বাইরে তাকিয়ে আছি। আমাদের বাগান নেই। যে যেমন জন্ম নিয়েছে তেমনি কিছু গাছ আছে।বেশ অনেক। তারাও আলোকের মধ্যে নিজেদের সবুজ মেশাচ্ছে।আমি নিঃসঙ্গ, নির্জন। যার যার ঘরে শুয়ে আছেন মা, পুত্র, স্ত্রী, বাকি পরিজন। একটু আগে কথা হল তমাল ও মেঘ অদিতির সঙ্গে। আরো কিছু ফোন এসেছিল, ধরিনি। এখন কি গান শুনব? কিন্তু এই লেখাটা তো লিখে শেষ করতে হবে।
গানের কথা ভাবতেই মনে এল এলানর রিগবিকে। সেই বিখ্যাত গান, বিটলস। সেখানেই হয়তো প্রথম জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল,
All the lonely people
Where do they all come from?
All the lonely people
Where do they all belong?’
এই গানটা কবে লেখা হয়েছিল। একটু ঘাঁটতেই দেখলাম, ঠিক ১৯৬৬ সালে লেখা হয়েছিল এ গান। আমার জন্মের তিন বছর আগে। এর আগে এই জিজ্ঞাসা জাগেনি কোনও শিল্পীর? কোথা হতে আসে এইসব একাকী মানুষ? তারা কাদের? বাংলা কোনও গান আছে এমন? ঠিক, মান্না দে। আমি আজ আকাশের মত একেলা। কত সাল? জানি না, অনুমান সে-ও গত শতকের ছয়ের বা সাত দশকের কোনো সময়ে হবে। এই সময়টা থেকেই একাকিত্ব মহামারির রূপ নিতে শুরু করে সমাজে।
একেলা, বললেই মনে আসে তিনজন মানুষকে। জীবনানন্দ, সিলভিয়া প্লাথ আরও দূর ভিনসেন্ট ভ্যান ঘঘ। এঁদের জীবনে কী মিল! নিদারুণ একাকিত্বের শিকার সকলে। সকলের সারাজীবনের কাজে অসাধারণ মৌলিকতা। সঙ্গলোভে চিঠি বা ডায়েরি লেখা আর শেষে অস্বাভাবিক মৃত্যু। তাঁরা কোথা হতে এলেন, কোথায় তাঁরা বিলং করেন?
ঘঘের জন্ম ১৮৫৩ মৃত্যু ১৮৯০। জীবনানন্দ ১৮৯৯ সালে জন্মান, মৃত্যু হয় ১৯৫৪ সালে। প্লাথের জন্ম ১৯৩২ সালে। মারা যান, ১৯৬৩ সালে। তাহলে এটা কি ঠিক অষ্টাদশ শতাব্দীতেই একাকিত্বের জন্ম, যা একুশ শতকে এসে মহামারির রূপ নিয়েছে আজ? ঠিক। সত্য। সমাজতাত্ত্বিক, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং সংস্কৃতির ইতিহাসবিদ সকলে এই সময়টাকে একাকিত্বের জন্মকাল বলে চিহ্নিত করেছেন।
নিঃসীম একাকিত্বের কথা এর আগে সাহিত্যেও তেমন পাইনি আমরা। হ্যামলেটের দীর্ঘ সলিলকিতে বেদনার এমন ব্যক্তিগত রূপ আমরা পাই না। আত্মহত্যার কথা ভাবছে বটে সে, কিন্তু সেটা ঈশ্বরের দ্বারা অনুমোদিত নয় বলে বাদ দিচ্ছে সেই ভাবনা। আর যে একাকিত্বের, নিজের সঙ্গে নিরন্তর কথা বলার আধুনিক রূপ, সেটা হ্যামলেটের সলিলকিতে নেই। তাহলে? আচ্ছা যক্ষের একাকিত্ব তবে কী? বিরহকাতর যক্ষও তো একপ্রকার চিঠিই লিখছে। যেমন লিখেছেন ভ্যান ঘঘ, জীবনানন্দের ডায়েরি কিংবা সিলভিয়া লিখছেন মনোবিদের কাছে। কিন্তু মেঘদূতে যক্ষ একাকী হলেও একাকিত্ব তার সমস্যা নয়। রামগিরি পর্বতে একাকী যক্ষের অনেক পরে আমরা আরেকজন একাকী মানুষকে পাব। ইংরেজি সাহিত্যে। রবিনসন ক্রুশো। ফ্রাইডেকে পাবার আগে পর্যন্ত মানুষ হিসেবে ক্রুশো বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপে একেবারে একা। কিন্তু যে একাকিত্বের হাতে খুন হয়ে যান সিলভিয়া, তা তো ক্রুশোকে আক্রমণ করল না। অত ভিড়ে থেকেও সিলভিয়া একাকিত্বের শিকার আর সত্যকার একা থেকেও ক্রুশো তা নয়? সত্য যে, ক্রুশো ডিফোর কল্পনাপ্রসূত চরিত্র, প্লাথ বাস্তব। হলেও, ডিফোর মাথায় একাকিত্বের অপশনটি আরোপ করবার চিন্তা তো এল না।
মজার কথা হল, এই সেদিন সম্ভবত, ২০০০ সালে একটি ছবি হয় আমেরিকায়। ‘Castaway’। এর উৎস ডিফোর রবিনসন ক্রুশো। কিন্তু কাস্টএওয়ে তে দেখা গেল একাকী নায়ক একটা ভলিবলে  রক্তাক্ত একটি মুখচ্ছবি এঁকে তার নাম রাখল উইলসন। আর এই উইলসন আসলে একটা ক্রীড়াসামগ্রীপ্রস্তুতকারী কোম্পানি। ছবিটি জনপ্রিয় হলে তারা উইলসন নামে একটা বলও বিক্রি করতে শুরু করে। তাতে সেই মুখটা আঁকা। এইখান থেকে একাকিত্ব নিয়ে আমাদের আড্ডাটা পাল্টে যাবে।
যদিও এই কথাটি বলতে অতকিছু বলবার দরকার ছিল না একাকিত্ব নামক মহামারিটি আসলে আধুনিকতার পার্শ্বফল তবু বললাম কারণ, প্রতি তিনজন বন্ধুর মধ্যে দুজন এতে ভোগেন দেখতে পাই। আমি নিজে ভুগেছি। মনোবিদের কাছে গিয়েছি। এই আধুনিক সমাজ আমাদের কী দিয়েছে? যন্ত্র, শিল্পোদ্যোগ আর বাজার। আমাদের অসুখবিসুখও এই হাঁ-মুখ বাজারের কাছে পণ্য। এই সমাজ আসলে সিলভিয়ার বেলজারে ঢাকা পৃথিবী
তবু কেন এমন একাকী?
তবু আমি এমন একাকী।
এই প্রশ্ন এবং স্বীকারোক্তিতে আসার আগে কবি কী বলছেন? বলছেন
সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে
সহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর? শরীরের স্বাদ
কে বুঝিতে চায় আর? প্রাণের আহ্লাদ
সকল লোকের মতো কে পাবে আবার।
সকল লোকের মতো বীজ বুনে আর
স্বাদ কই, ফসলের আকাঙ্ক্ষায় থেকে,
শরীরে মাটির গন্ধ মেখে,
শরীরে জলের গন্ধ মেখে,
উৎসাহে আলোর দিকে চেয়ে
চাষার মতন প্রাণ পেয়ে
কে আর রহিবে জেগে পৃথিবীর
পরে?
সহজ নেই আর মানুষ। এই যন্ত্রসভ্যতা আমাদের প্রথমেই জটিল করে দিয়েছে। শরীর থেকে মাটির গন্ধ কেড়ে নিয়েছে। যৌনতা, বিবাহ, প্রেম পরকীয়া সব জটিল হয়ে গিয়েছে।  আর ডিজিটাল বিপ্লব আমাদের একেবারেই ঘরে বন্দি করে দিয়েছে আজ। আমরা নিসর্গচ্যুত।
জীবনানন্দ তাঁর রূপসীবাংলা থেকে বিচ্যুত। প্লাথ তাঁর আধাশহর থেকে বিচ্যুত। ঘঘও বারবার বিচ্যুত। আজকের মানুষ জন্ম ও কৈশোরকালীন নিসর্গ থেকে বারবার বিচ্যুত হয়। কেবল নগরের দিকে ছোটে। কিংবা নগর ছুটে আসে তাদের কাছে। যে নৈসর্গিক সঙ্গ একাকিত্বকে আন্দময় করে তোলে, সে নেই আর।  তাই, যে আকাশকে আমার এই ২০২০ সালে একেলা মনে হয় না। আলো আর রঙের উৎসব বলে মনেহয়, তাকে আধুনিক গানের গীতিকার একেলার উপমা করে কেন বলেন, আমি আজ আকাশের মত একেলা? কারণ আমার আকাশ বিশাল, বিস্তৃত এখনও। এখনও আমার আকাশ বহুতলের ফাঁক দিয়ে আমার দিকে উঁকিঝুঁকি দেয় না।আমি নিসর্গচ্যুত নই। তবে যে আমিও মনোবিদের কাছে গেলাম? কারণ একাকিত্ব ছোঁয়াচে। এমন যে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে গ্রেট ব্রিটেন ‘Mninister of Loniless’ তৈরি করে। জো কক্স ছিলেন এই দফতরের  প্রথম মন্ত্রী। একাকিত্বকে মহামারির মতন করে বিচার করেছে তারা। তাই আধাশহরবাসী আমাকেও নাগরিক রোগে আক্রমণ করে কিংবা আমিও সংক্রমিত হই। কারণ,আমরা  আজকাল  সহজে আত্মবিচ্যুত হই। আশা করি। বিবাহের কাছে, সমাজের কাছে, বন্ধুর কাছে আমাদের আশার অন্ত নেই। আশাহত হই। পিতার কাছে আশাহত হয়ে গিয়ে সুখসাগর জলার কাছে বসি। কিংবা, আমরা অতীতচারী হয়ে পড়ি। আর নস্টালজিক হয়ে পড়াকে একাকিত্ব সংক্রমণের প্রথম উপসর্গ বলে চিহ্নিত করেন অনেক মনোবিদ। আত্মবিচ্যুত মানুষের অন্তর একেবারেই শুকিয়ে যেতে থাকে।ভারি হয়ে যায়। শেষে এই দেহ, যেটার ভেতরে শুকনো একটা অন্তর তাকে শেষ করে দিয়ে ভাবি, যাক বাঁচা গেল। কিন্তু মৃতেরা কি ভাবতে শিখেছে?
তাহলে? আরেকরকম একাকিত্ব আছে। ভাবনা করবার একাকিত্ব। Solitude. এই শব্দের সঠিক বাংলা আমি জানি না। একান্ত?  আমাতে শেষ। আমি একজনেই অন্ত। সেই একান্তে বসেই ভগবান বুদ্ধ আবিষ্কার করেন অন্তহীন জরার থেকে মুক্তির উপায়। তারও আগে উপনিষদ ভাবিত ও রচিত হয়। ভগবান মুহম্মদের কাছে আসেন ঐশী কোরআন। ভগবান যিশু পান প্রেমের বারতা। রবীন্দ্রনাথ পান মানসী লেখার ছন্দরূপ। তাঁরা আত্মসম্পৃক্ত হতে পেরেছিলেন। আধুনিকতা আমাদের দিয়েছে আত্মবিচ্যুতির নানাহ উপায়। আমরা তাদের দ্বারাই একাকিত্বে সংক্রমিত হই।

এই মহামারিকালে আমাদের জোর করে একাকী করা হয়েছে। এখন সুযোগ ছিল, আত্মস্মপৃক্ত হবার। আমরা কেন সেই সুযোগ না নিয়ে, ডিজিটাল সমাজ বানিয়ে সেই সশব্দ হাহাকার দিয়ে একাকিত্বকে প্রচার করছি? একান্তে বসে এই আমার জিজ্ঞাসা।

(যখন ভুগছিলাম, তখন একাকিত্ব নিয়ে খুব ঘাঁটাঘাঁটি করেছি। পড়েছি। নিজেকে সামলেছি। সেইসব পাঠ এ লেখাটায় কাজে এসেছে) 

......................................................................................................................................................


কিছুদিন আগে এক বন্ধুর সূত্রে এই বইটির সন্ধান পাই। পড়ে মান্য করলে জীবন পাল্টে যাবে। (অ্যামাজন এফিলিয়েটেড)