বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৭

কন্যাতীরে

অশোক দেব
কন্যাতীরে

এক.
এক দেশে এক গ্রাম ছিল। দেশটা কি ছিল? ছিল কি ছিল না, গ্রামের মানুষ জানতো না। কিন্তু গ্রামটা যে আছে তারা বোঝে। মানে, তখনও বুঝতো, এখনও বোঝে। সেই গ্রামের ধারে একটা নদী ছিল। তার নাম কন্যা। তবে, সকলেই তাকে নিজনিজ কন্যার নামে ডাকতো কেউ ইচ্ছে করলে কন্যাকে নিজের পুত্রের নামেও ডাকতে পারতো। কন্যা মানা করতো না। কিছু মনেও করতো না। নদীর পরে ছিল মাঠ। অনেক দূরের মাঠ। এদের কারণেই কন্যাতীরের ওই গ্রামকে সকলে গ্রাম বলতো। সেই গ্রামে সকলেই দরিদ্র। কেননা, তাই থাকতে হয়। তাছাড়া গ্রামের মানুষগুলি মধ্যবিত্ত হতে চায় না। মধ্যবিত্ত না হলে কী করে ধনী হবে! ওরা তাই ধনী হয়নি। মাঝারি হলে কী জ্বালা সেটা ওরা নকুল ডাক্তারকে দেখে বুঝেছিল। নকুল ডাক্তার হোমিওপ্যাথি পারেন।  অ্যালোপ্যাথিও জানেন কিছুটা। ছুরিকাঁচি সেদ্ধ করে ফোঁড়াও কেটে ফেলতে পারেন। আবার অকালপোয়াতির পেটে কী একটা ঢুকিয়ে দিয়ে কুঁড়ে কুঁড়ে বাচ্চাও কেটে আনতে জানেন। এসব কাজ গ্রামের জন্য নয়। শহরের জন্য। কোথা হতে যে এরা পেটের বাচ্চা খুবলে আনতে আসে!
          গ্রামের যেকোনও মানুষকে নকুলডাক্তার রোগী ভাবেন। হারামজাদা, শালারপুত বলে পুরুষদের গালি দেন। মহিলাদের বলেন শালীর শালী। রাস্তায় কাউকে দেখলেই, আরে হারামজাদা, তোর তো এমনই হবে। কালকে আসবি চেম্বারে। দেখে দেব। মোরগ আছে? এমন বললেই হল। যে চেম্বারে যায়নি, তার বিপদ। মোরগ হলে মোরগ, টাকা হলে টাকা। কারণ, পরের দিন চেম্বারে না গিয়ে রসিক মরেছিল সত্য। তখন সে খেজুর গাছের সঙ্গে কথা বলছিল। আর গাছের গলা চাঁছছিলো। রসিকের নামটা সার্থক। তার রসের কারবার। সে খেজুর গাছের গলা চেঁছে দেয়। মরা গাছের থেকেও রস বের করে আনে হেমন্তে, শীতে। তো, সেদিন গাছ চাঁছার সময় তার বুকে একটা কুত্তা ঢুকে পড়ে। বুকের ভেতর কোথাও একটা ঘ্যাঁত করে কামড় দেয়। কোমরে দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে রসিক নিজেকে বেঁধে রেখেছিল। গাছে আড়াআড়ি করে বাঁধা একটা বাঁশের পা-দান ছিল । তার ওপরেই দাঁড়ানো ছিল রসিকের শরীর। রসের কারবারিদের যেমন থাকে। কোমরে দুলছিল একটা তূণের মতন খাঁচা। তাতে নানারকম দা, ছেনি। অন্যদিকে একটা কাঠের ছোট আঁকশি, তাতে ঝোলানো ছিল একটা মাটির কলসি। দা রইলো। ছেনি রইলো। দড়িতে বাঁধা রসিক রইলো। খেজুর গাছটাও রইলো। মৃদু মৃদু বাতাসে খেজুরের লম্বা পাতা সবটা দুলছিলো তেমনি কাঁপছিলো একটা একটা  আলদা পাতাও। এসব রইলো। সব রইলো। শুধু রসিকের প্রাণটা উড়ে গেলো। রসিকের নানা রঙ্গ করার দোষ ছিলো। সে লোককে ডেকে বলতো, রস নেবে, মাগনা? ঘটি নিয়ে এসো। কেউ এলে সে কলসি উপুড় করে দিতো। আসলে কলসিতে রসই নেই। তারপর খ্যা খ্যা করে হাসতো। সাপে খেলো, সাপে খেলো বলে সে সুন্দরীর বাড়ির উঠানে গিয়ে আর্তনাদ করতো অন্ধকারে। ঘর হতে আলো নিয়ে সুন্দরী ছুটে আসতো যেকোনও সুন্দরী। কাছে এলে রসিক ফু দিয়ে বাতি নিভিয়ে সুন্দরীর বুক টিপে দিতো। পরে বলতো, আরাম হল?। এই করে রসিক হাল্কা করেছে নিজেকে। তবু, সে যতবার সাপে খেলো বলেছে, সুন্দরী এসেছে। তবু, সে যতবার রস নেবে গো, মাগনা বলে ডেকেছে, লোকে ঘটি নিয়ে এসেছে। কারণ, রসিকের গোপনে একটা রসিক বড়ই সত্য। একা একা সে পারে না। একটা কিছু রান্না হলে সে জনে জনে ডেকে খাওয়ায়। বীজধানের যত্ন তার মত কে আর জেনেছে! যার বীজ থাকে না, তার রসিক আছে। ফলে রসিকের ব্যাপার অনেকটা বিশ্বাস কিছুটা অবিশ্বাস। সেদিন, সেই রসিক কোমরের দড়ির বাঁধনে আটকে ছিলো খেজুর গাছে। কোমর থেকে উল্টে তার বুক থেকে মাথা পর্যন্ত ঝুলছিলো নীচের দিকে। পা হড়কে গেছে বাঁশের পা-দান থেকে। এখন গাছ মাঝখানে রেখে পা দুটি দুদিকে। অনেকে দেখলো। কেউ কেউ বলল, হেই রসিক, এটা আবার কোন্‌ সার্কাস, মাথায় রক্ত উঠে গেলে টের পাবি। কেউ বলল,  কি রে, রসে কি আজকাল মদের নেশা? রসিক ছিলো। তার প্রাণ ছিল না। ফলে একরাত ঝুলে থেকেও সে কিছু বলতে পারলো না। পরের দিন বিকালে রসিকের বউয়ের কান্নায় অনেকে এসে নামিয়ে আনে তাকে। তখনও কেউ যেন বলল, লাথি মার, ঢং ছেড়ে যাবে। কেবল, নাড়ি টিপে দেখলেন নকুল ডাক্তার। বলে দিলেন, বলেছিলাম চেম্বারে যাস, গেলো না। নাই রসিক যে রসিক ফু দিয়ে বাতি নেভাতো, তার জন্য সন্ধ্যাবাতি দিল না কন্যাতীরের সুন্দরীরা। দুইদিন।

          এইসব কারণে, হাসিখুশি মানুষকে চেম্বারে যেতে বলে বলে, কন্যাতীরে একমাত্র নকুলডাক্তার হয়ে গেলেন মধ্যবিত্ত। দূর দেশ হতে কুমারী মেয়েদের পেট খালাস করতে ধনীরা আসে। নকুল ডাক্তার সেইসব ধনীর সামনে আর্দালির মতন কিঁউ কিঁউ করেন। আর গ্রামের মানুষকে বলেন, হারামজাদা আর শালীর শালী। এইরকম আর কেউ হতে চায় না গ্রামে। ফলে, কেউ আর চায় না ধনী হতে। কারণ, পুরো ধনী হবার আগে একবার নকুল ডাক্তার হতে লাগে।
দুই.
এই নকুল ডাক্তার সদানন্দের বাবা হন। তিনি সদাকে সত্যকার ডাক্তার বানাতে শহরে রেখে পড়ান। সদানন্দও একটা গুল্লি। তার মতন একটা মাথাওলা ছেলে নাই। কন্যাতীরের মানুষের বিশ্বাস, এমন ছেলে দেশেই নাই। নকুল ডাক্তার মনে করেন, পৃথিবীতে নাই। সেই সদানন্দ একদিন ডাক্তার হয়ে ফিরে আসে। মহকুমার হাসপাতালে তার চাকরি আর বাবার চেম্বারে ব্যবসা। বাবা টিপেটুপে ওষুধ দিতো। সদা প্রেসার মাপে। কানে লতি লাগিয়ে বুকের খবর নেয়। মানুষকে সে হারামজাদা বলে না। কাকা-জেডা, ভাই-দাদা বলে। মহিলাদেরও কাকি-মাসি, দিদি-বোন বলে। সে মোরগ নেয় না। টাকা নেয়। দিলেও আচ্ছা, না দিলেও আচ্ছা। সে আবার গান গায়। একদিন নকুল ডাক্তার ধনী হয়ে গেলেন। দক্ষিণে মুখ করে তাঁর ইয়া বড় দোতলা দাঁড়ালো। পুকুরের দিকে মুখ। আবার রাস্তার দিকেও। সদাকে কেউ সদাডাক্তার বলে না। বলে ডাক্তার সদা। বাড়ি হয়ে গেলে সদার বিয়ে হয়ে গেলো। বউভাতে গ্রামের মানুষকে নিমন্ত্রণ করা হল না। দূর দূর থেকে গাড়ি ভরে ভরে মানুষ এলো। জগতে এত কিসিমের গাড়ি আছে? মানুষের এত সুন্দর সুন্দর বাচ্চা আছে? ওরা কন্যাতীরে খেলল। হেসেছিলো তারা। যা দেখছিলো, তাতেই অবাক হচ্ছিলো। এমনকি গোরু ছুঁয়ে দেখছিলো। সকল গাছের কাছে যাচ্ছিল।গ্রামের হাওয়াকে পেতে দিচ্ছিলো মুখমণ্ডল। গ্রামের মানুষ তাদের দেখেছিল। কিন্তু কেউ নকুল ডাক্তারের বাড়ির দিকে যায়নি। বিস্ময় হল পরের দিন। একটা কেমন গাড়িতে করে সদানন্দ বেরোল। তেমন তো রাস্তা নেই, কিন্তু গাড়িটা চলে যাচ্ছিল সকলের বাড়িতে। মাঠ দিয়ে নাচতে নাচতে, রাস্তায় থমকে থমকে, হেলতে দুলতে। প্রথমে ডাক্তার সদা গেলো শচীজেঠার বাড়িতে। পৃথিবীতে এই ঘটনা প্রথম। সদানন্দ গিয়ে গ্রামের প্রতিটি মানুষকে প্রণাম করছিল। সকলকে আগামী বুধবার নিজের বউভাতে নিমন্ত্রণ করছিল। নতুন বউ নিয়ে কেউ কি আসে ঘরের দাওয়ায়? এখন, কেউ হাতের লোহাটাই খুলে বৌমাকে দেয়, কেউ চারটে বেগুন পেড়ে আনে, কেউ আসন হতে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এনে হাতে তুলে দিতে যায়। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে সারা মাস এক মুষ্টি করে চাল রাখা। বউটা হাসে। মুসলমান নাকি? সবকিছুকে বলে ফানি ফানি। আর তার সাথে ওই একটা ছোকড়া সাধু। গেরুয়া পরা। কী স্টাইল। বউটা তার সঙ্গেই লেপটে থাকে বেশি। লাজ নাই।


     সেই বুধবার গ্রামের সকলে গিয়ে উপচে পড়ে নকুল ডাক্তারের বাড়ির ইয়া বড় উঠানে।আগের দিনের কিছু ভাঙা হয়নি। আগে যেমন টেবিলচেয়ারে খাওয়াদাওয়া, সেই টেবিল চেয়ার রইলো। খাবার দিলো শহর থেকে আসা কিছু স্যার-স্যার চেহারার ছোকড়া। সেই থেকে নকুল ডাক্তার আর কাউকে চেম্বারে যেতে বলে না। কাউকে হারামাজাদা, শালীর শালী বলে না। নকুল ডাক্তার বাড়ি থেকে বেরোন না।
তিন.
এক দেশে এক গ্রাম ছিল। গ্রামে বাস করত এক ডাক্তার। ডাক্তার সদানন্দ দাশগুপ্ত। সদানন্দের বিবাহ হয়েছে চার বছর। সদানন্দ নিজেকে ডাক্তার কম, কবি বেশি মনে করে। সদানন্দ গান গায়। গ্রামের মানুষের মতই সে আদাড়বাদাড় ঘোরে। ডাক্তারি করে দূরে মহকুমা শহরে। সেটা সেরে সে আর ডাক্তার থাকে না। চলে যায় শীতলাতলায়। তাস খেলে। আর সন্ধ্যাবেলা দাঁড়িয়ে গান গায়। ডাক্তার সদানন্দ বিজলি বাতি এনেছে। কৃষিকাজ যে এগ্রিকালচার, সেটা তার আগে কে জেনেছে? কৃষিকাজ দেখভালের জন্যেও সরকারি বাবু আছে, কে আগে জেনেছে? সদানন্দ মাঠে গিয়ে নামে। নকুল ডাক্তার জমি তো কম করেনি। সে জমিতে পুকুর করেছে সদানন্দ। হাজারটা হাঁস, মোরগ। মৌমাছি যে এমন বাক্সে করে পোষ মানানো যায়, সেটাও কি কেউ জানে? সদানন্দ পারটিলা এনেছে। পাওয়ার টিলার। গ্রামের ছেলেরা সেসব বেশ চালাতে জানে। গ্রামে সবার বাড়িতে একটা করে পায়খানা হল। পাকা। সদানন্দ কী করেছে, সরকারই দিল খরচাপাতি। এখন ডাক্তার সদানন্দ যা বলে তাই নিয়ম। আর কী তার গানের গলা! কেমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে গান বাঁধে। লহমায়। শীতল সরকার যে এত বড় কবি, সে-ও এসে একবার লড়ে গেলো তার সাথে। হেরে গেলো। লবকুশ সহ সীতামাকে বনে দিয়ে আসাটা রামের সত্যি ঠিক হয়নি। সদানন্দ স্পষ্ট করে গেয়ে দিল সেই কথা। শীতল সরকার হার মানলো।
          কিন্তু ডাক্তার সদানন্দ তো ওই কন্যাতীরে গিয়ে বসে থাকে একা। দূরের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। বিকালে কে না দেখেছে সদানন্দ মাঠ পেরিয়ে কোথায় চলে যায়! ওই বনে বাঘভাল্লুক নেই, কিন্তু সাপের তো অভাব নেই, না? সদা যায় কোথায়? সদানন্দ আসলে কেমন! তার বউ থাকে কই জানি। শনিবার আসে, রবিবার থাকে সোমবার যায়। কই যায়?
 ইংরেজি ঝগড়াগুলো বাংলার থেকে নিষ্ঠুর
সদাবউ ইংরাজিতে সদাকে গালি দেয়
সদানন্দ নীরব থাকে
সদাবউ কেবল বলে, হেল হেল... হেল...
পারুলের মা বোঝে হেল হল একটা অভিশাপ
। হয় এই অভিশাপটা সদাবাবা বউকে দিয়েছে, নাহয় বউ সদানন্দকে দেয়, প্রতিদিন। আর ওই ছোকড়া গুরুটা মিটি মিটি হাসে। তার যে কী গুরুগিরি কেউ জানে না। কী যে তার ধর্ম! গিটার বাজিয়ে কীর্তন করে সে। তাতে না আসে ভক্তি, না আসে ভাব। ওইটুকুন গুরু, সদাকে বলে, বাবা যেনো সদানন্দ তার ছেলে।  সদা চোখমুখ দিয়ে তাকে অস্বীকার করে।
          পারুলের সময় পারুলের মায়ের সূতিকা হল। নকুল ডাক্তার বাঁচালেন। সেই থেকে এই বাড়িতে সারাদিন থাকে পারুলের মা। খেটে দেয়। খেতে পায়। রাতে কেবল নিজের ঘরে যায়। স্বামী মরে গেলে আর যায়ই না। পারুল একদিন পালিয়ে গিয়েছিল নারুর সাথে। এখন থাকে অনেক দূরে। এখন এ বাড়িই পারুলের মা-র বাড়ি। সে জানে, ডাক্তার সদানন্দ আসলে হেরেছে। একদিন সাহস হল তার। শত হলেও সদানন্দ তার সন্তান। সদা এলো আর তার মা মরলো। পারুলের মা-ই তো সব করলো। সেই টানে সাহস হল তার। গুরুর ঘরে ঢুকে গেলো পারুলের মা। গুরুকে গিয়ে সোজা বলে,
    বাবু তোমার বয়স কত?
    তোমার কী চাই মা?
    চাই টাই না, বয়স কত বল?
    সে দিয়ে তোমার কী হবে, বল তো...
    তুমি আমার সদাবাবারে মুক্তি দাও, ওইটুকুন ছেলে...
    মুক্তি? মুক্তির জন্যই তো এতকিছু
          বউটা তখনও তার কোলে মাথা রেখে শুয়েছিল। গুরুটার লম্বা দাড়ি। তার একটাকে আঙুলে পাকাচ্ছিল সদাবউ। মাঝে মাঝে টান মেরে ব্যথা দিচ্ছিল গুরুকে। ব্যথা পেলেই ওই গুরুটা খানকির মত চোখ করে হাসছিল। আর কোথাও, কী করে যেনো, গোপনে, বউকে চিমটি কাটছিল। বউটাও ঝিনকি তুলছিল। পানের পিক, পানের ছাবা, খয়েরের কালো আর পুরাতন বৈধব্য এক করে পারুলের মা ঘরের মাঝখানে ছিটিয়ে দিলো। সব ভেঙে গেলো তারপর।
চার.
ভেঙে গেলে মানুষ বনে চলে যায়। কন্যা পেরিয়ে এসে সদানন্দ এই বনে চলে আসে। এর আগে অনেক মানুষ এসেছে। মানুষকে দু পায়ে দাঁড় করানোর আগে পৃথিবী পথ কাকে বলে জানতো না। এখন যত ঘন বনই হোক পৃথিবী নিজে পথের সম্ভাবনা সাজিয়ে রাখে। সদানন্দ সেইরকম একটি পথ দিয়ে হেঁটে চলেছে। সে যত এগোয়, তার ভাঙা ভাঙা জিনিসগুলো তত তাকে ছেড়ে ফিরে চলে যায়। যেতে যেতে যেতে, হেঁটে হেঁটে, সদানন্দের তৃষ্ণা পেল। অনেক দূর হাঁটলে পরে মানুষের তৃষ্ণা পায়। বাতাসের শীতলতায় সদানন্দ বোঝে কাছেই কোথাও জল আছে। ঝোপ সরিয়ে সদানন্দ দেখে এইসব ভেঙে যাওয়া সত্য নয়। ওই ঝিলটা সত্য। এটাই হয়তো এই বনের নাভি। জলনাভি। সদা কাছে যায়। জল খিলখিল করে ওঠে। ঝিলের পাড়ে একটা গাছ। বৃক্ষ। সব পাতা যেনো কারও আধবোজা চোখ। সদা আঁজলা ভরে জল খায়।
    কিছু কি ভেঙেছে তোমার?
সদা গা করে না। এ ঘোর জঙ্গলে কে আর কথা বলবে এমন সুরেলা কণ্ঠে? সদার বিভ্রম হচ্ছে। সে আরেকবার জল নেয় আঁজলা ভরে।
    কে তোমায় বিদ্রূপ করে?
    কে কে?
এবার সদানন্দ সচকিত হয়। বউ তাকে গাইঁয়া বলে। মধ্যবিত্ত বলে। বিয়ের মানে বোঝে না বলে। বলে সদানন্দ চাষাড়ে। বলে ভূত, পাগলছাগল। সদানন্দ সত্যিই চমকে যায়, কে তুমি?

          হস্তিনী আসবে টের পেলে যেমন ছোট প্রাণীরা সরে যায়, তেমনি সরে গেল সন্ধ্যা। দূরে ওই গাছের নীচে গিয়ে গুটিসুটি বসলো। স্পষ্ট দেখতে পেয়ে সদানন্দ ভয় পায়। আবার ভয় পাচ্ছে জেনে তার নিজেকে হাস্যকর মনে হল। এমনি এক সন্ধ্যায় সে এক মায়াবী মেয়েমানুষকে কবিতা পড়ে শুনিয়েছিল শহরের সবচেয়ে নির্জন নদীপাড়ে। এমন সন্ধ্যাগুলিতেই পৃথিবীতে মেয়েরা কবিদের প্রেরণা আর বিষ পাঠায়। বলেছিল সে। সেইসব মনে হয়।মনে হতেই ঝিলের মাঝখানের জল কেমন একটা ঘূর্ণির মতন ওপরে উঠে গেলো। সেটা স্থির হলে উঠে এলো এক নারী। না, সোনার মুকুট নেই, তেমন কিছু সাজ নেই। কেবল ওই একটি হাসি আছে
। শান্ত জলে ঢিল পড়লে যেমন জল সরে যায়, তেমনি সন্ধ্যাকাল সরে যাচ্ছিলো আরও দূরে। আর ওই নারীর শরীর হতে একটা সুগন্ধি আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিলো।
    তোমার কী ভেঙেছে?
    কেন?
    বল
    তুমি কে?
    আমি তোমার নুনুদিদি
    না।ও তো বিচ্ছিরি ছিল
    থাক তবে, আমি শিবু পাটোয়ারি
    সে তো পুরুষমানুষ ছিল
    ও, আমি রসিক, আমি দিলীপ নাগ, আমি শ্যামলতনু
    এই এই, বেছে বেছে এদের নাম নিচ্ছ কেন? কে তুমি?
    আমি হাঁটি। পথে পথে। ঘরে ঘরে যাই। যাদের সকল ভাঙে, যারা সকলের কাছে হেয় হয় তাদের ঘরে যাই।  হেয় হতে হতে গাছের কাছে গিয়ে নালিশ করে যে, আমি সেই রসিকের কাছে যাই। শ্যামলতনুর কাছে যাই। সে রাতের পর রাত চেষ্টা করে একটা গান বাঁধতে পারে না।আমি দিলীপ নাগের কাছে যাই। সে আর আগের মতন পট আঁকতে পারে না। লক্ষ্মী এঁকে নিজেই নিজের আঁকা পটকে বেশ্যা বলে গালি দেয়। আমি তার কাছে যাই। এরা অকারণ ভেঙে যায়। বছরের পর বছর রোগে ভুগে ভুগে যখন নুনু আর পারে না, তার কাছে আমি যাই। সে-ও ভেঙে যায়। ভাঙা মানুষ জোড়া লাগাতে সময় নেই কারও। এমনকি, নিজেকে সবটা দিতে চেয়ে নেবার লোক পায় না বলে অনেকে ভেঙে যায়। তাদের কাছে যাই আমি। তুমি তো নিজে চলে এলে...
    আমি তো তোমার কাছে আসিনি
    আমার কাছেই এসেছো। এতকাল চেষ্টা করেছো, আসতে পারোনি আজ এসে গেলে... চলো
    কোথায়?

          গাছের নীচে জমাটবাঁধা সন্ধ্যা ছুটে এসে সদাকে কী দিয়ে মুছিয়ে দিলো। শীতল শীতল। সারা গায়ে কেমন আনন্দ। সামনে ওই রহস্যময়ী নারী, সদানন্দ তার পিছু পিছু যায়। যেতে বাধ্য হয়। একটা বিদেশি গমক্ষেত। সোনালি হলুদ। তার আকাশে কয়েকটা উড়ন্ত কালো কাক স্থির হয়ে আছে। এ গমক্ষেত সত্য নয়। কে যেন এঁকেছে। একটা এঁকে রাখা হাওয়াকলের নীচে দাঁড়িয়ে হাত নাড়লো একটা লোক। তার এক কান কাটা। তাতে ব্যান্ডেজ।সদানন্দ হাত নাড়াতে যায়, চেয়ে  দেখে লোকটা নেই। গমক্ষেত, কাক সেসব কিছু নেই। উল্টে কারা যেন একটা ট্রামলাইন পেতে দিল। আকাশ হতে ঝুলতে লাগল বাসি সব ডিমের বড়া। ট্রামলাইন দিয়ে পেছনে ঘা নিয়ে ছুটে আসছে একটা ষাঁড়, নাকি ট্রামই? একটা লোক গোঁয়ারের মত মাথা নিচু করে তার দিকে হেঁটে যাচ্ছে। আর এদের সকলকেই ঠেলে দিচ্ছে গিটার হাতে একদল তরুণ গুরু। তাদের দাড়ির থেকে ঝুলছে ছোট ছোট বিদ্রূপাত্মক গান। দূরে কারা যেন লালনীল শাড়ি শুকোতে দিয়েছিল... সেসব এখান সাদাকালো দেখাচ্ছে... কে একটা লোক সিনেমার ক্যামেরার পেছনে বসে সিগারেট খাচ্ছিলো...

(প্রকাশিতঃ যাপন কথা) 

রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সদাপুরাণ-২৪



অশোক দেব
সদাপুরাণ-২৪

গপিস্ট কি সত্য বলেন নাকি মিথ্যা? তাঁর মতে সত্যনারায়ণ একাধারে হিন্দুর দেবতা আবার মোছলমানের পীরযা-ই হোক, এখন জোছনাকে লাগছে সত্যনারায়ণ পূজার সিন্নির মতনআকাশ হতে কুয়াশার পাত্রে পরিবেশিত হচ্ছে জোছনা যেন প্রসাদ। মনের মতন করে সাজানো নৌকাটি পেট ভরা আনন্দ নিয়ে ভাটির দিকে যাচ্ছে। নদীর যেটুকু প্রবাহ, সেটাই তার গতি। হাল ধরে আছে মাধব। সে কি পুরুষ না খোজা কেউ জানে না। কেবল মুচকি মুচকি হাসে। সেই হাসিটুকু ছাড়া আর কোনও ভাষা জানা নেই তার? তবে সে নদীর ভাষা জানে। নদীকেই সে মাগী বলে। আর কাউকে মন্দ বলে না। খায় কী যেন সারাক্ষণ। কী যেন চিবাতে থাকে। মুদ্রাদোষ। ‘মাধবাদা, সারাদিন কিতা চাবাও?’ মাধবের বাঁধা উত্তর, ‘লাইফ’হয়তো সে একটিই ইংরেজি শব্দ জানে। হাল ধরে আছে। মুচকি মুচকি হাসছে আর লাইফ চিবুচ্ছে। এ ছাড়া নৌকা কেউ বাইছে না। বৈষ্ণবীর চর হতে এসেছে নিখিল। নৌকায় মানুষ নেই। সকলে ঘুঙুর। এমনকি নৌকাটি নিজেও। নিখিলও ঘুঙুর, আগে জানতাম না জোছনা এসে নদীর দুপারে হঠাৎ গাঢ় হয়েছে। পাড়ের একেবারে ধার ঘেঁসে যে জোছনা সেটি হাল্কা। তার সুর আকাশের সঙ্গে মেলানোইতিউতি শেয়াল আছে। ছোট ছোট ঝোপ হতে মুখ বের করে। আবার লুকিয়ে যায়। নিশ্চয়ই আছে কোনও পেঁচা ওই যে অশ্বত্থ গাছে। তার কাছে আঁধার আর জোছনায় ভেদ নেই। সে-ও আসলে ঘুঙুর। একটা কোম্পানি চেয়ারে বসে আছেন গপিস্ট বুড়া। এটা কোন এক চা বাগানের ম্যানেজারের ছিল। চেয়ারটা গপিস্টের পছন্দ হলে নিয়ে আসেন। তিনি যা চান, সেটা চান। চেয়েছেন মানে হাসিল করেছেন। প্রাণকৃষ্ণ আচার্য এসেছেন। তিনিও ঘুঙুর। গান গাইবেন। দূরে দূরে মানুষের বাড়িঘর এখন আলয় হয়ে আছে। ছোট ছোট আলো। জ্বলতে হবে বলে জ্বলে আছে। গপিস্ট চারদিকে তাকান না। চোখ বুজে থাকেন। জরিনার মানা পেরিয়ে মজিদভাই আসতে পারল না। আমি এলাম। আমার জন্যও একটা বাহারি চেয়ার এসেছে। বসে আছি। সত্যই বলেন গপিস্ট। নদীর নিজস্ব গান আছে। জল হতে উত্থিত একটি শব্দও আসলে নয়েজ নয়। মিউজিক। যাত্রীরা সব একটা আনন্দ পরিধান করে আছে। আমার কেবল মনখারাপ। কেন মানা করেছিল জরিনা? এ নৌকাটা কি মৃত? নৌকার শবদেহে বসে ভেসে চলেছি আমরা? যেমন মৃত গবাদির বহমান শরীরের ওপরে বসে ভেসে যায় শকুন।
          এখন ছাতারিয়া গ্রাম পেরিয়ে যাচ্ছি। আগে ওই গ্রামে যাবার একমাত্র উপায় ছিল সাঁতরে যাওয়া। সাঁতারিয়া। সেই থেকে ছাতারিয়া। বাঁদিকে বৈষ্ণবীর চর। অনেক অতীতকালে গোমতীর নিজের খাতবদলের দরকার পড়েছিল। যেমন সর্পিণীর খোলশ পাল্টানোর প্রয়োজন হয়। গোমতী তাই একটা মড়াগাঙ ফেলে রেখে এইখানে চলে আসে। সেই খোলশ ছেড়ে এই পশ্চিমে আসার সময় নদী বিশাল এক চরা প্রসব করেছিলনতুন সেই চরায় কোথা হতে এক বৈষ্ণবী আসে। আখড়া গড়ে। সূর্যাস্তের মতন গায়ের রং ছিলো তার। ক্ষীপ্রতায় তিনি পানক সাপ। তার আখড়ায় অচেনা ছেলেরা আসে। তারা সারাদিন ঘুমায়। রাতে জাগে। রাত জেগে কী সব করে। এইসব কথা গপিস্টের কাছে শোনা সত্যমিথ্যার মালিক ওই গপিস্ট, রহিম মিয়াঁ। তিনি বলেন বৈষ্ণবী আসলে অনুশীলন সমিতির লোক ছিলেন। আর ছেলেরা রাত জেগে অস্ত্রচালনা শিখতো। রাজা সব জেনেও বাধা দিতেন না। সেই হতে এই এলাকার নাম বৈষ্ণবীর চর। বৈষ্ণবীর চরের নিখিল পাল আসলে নাকি ব্যর্থ প্রেমিক। এখন ঘুঙুর আর প্রাইমারি টিচার। গান গায় এমন যেন সে গানের সঙ্গে সঙ্গম করছে। তাই করে করে ব্যর্থ প্রেমের শোধ তোলে নিখিল।
          সোনালীর মা তার রূপের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে যাননি এখনও।  দক্ষিণ স্তনখানি একটু দেখিয়ে শাড়ির আঁচল সাজানো। যেন আঠা দিয়ে লাগিয়ে রাখা ওই শাড়ির পাড়একটুও সরে না। সরলেই যেন আঁচলকে শাস্তি দেওয়া হবে। সোনালীর মা-ই নৌকার সকল নারীদের নেত্রী।  এরা সবাই মিলে গোমতীর ঢেউয়ের সঙ্গে কী একটা মিশিয়ে দিয়েছে আমার খুব নেশা হচ্ছে। কেমন তন্দ্রা পাচ্ছে কামরাঙাতলী পেরিয়ে যাচ্ছে নৌকা। গপিস্টের পায়ে একরকমের মোজা। না হ্লুদ, না লাল। না সুতা না উল। এ যেন কী দিয়ে তৈরি। কেউ এসে গাঁজার কল্কি তাঁর সে মোজায় ছুঁইয়ে নিচ্ছে। কেউ এসে মদের পাত্র। সোনালীর মা ব্যস্ত। মেয়েরাই এসবের প্রধান ব্যবস্থাপক। ‘আরেট্টু গেলেই তো কুর, মনে আছেনি রে মাধব’গপিস্ট হাওয়ার মধ্যে বলেন। মাধব লাইফ চিবানো একটু বন্ধ রাখে। হাসিটি আছে। ‘আমরা কুরের কাছে গেলে এনা কুর। না গেলে কিয়ের কুর? আমনে আমারে নি শিখান গুমতির ঢং? মাগীরে আমি তিলে তিলে চিনি’কামরাঙাতলীর বিস্তীর্ণ মাঠ পেরিয়ে বাঁদিকে হঠাৎ একটা টিলা। ওপরে মাটি নীচে পাথর। সেখানে এসে গোমতী বাঁক নিয়েছে। আর প্রায় তিন কিলোমিটার ব্যাপে একটা ঘূর্ণি গড়েছে। কুর। জল ঘুরে ঘুরে কেবল নীচের দিকে চলে যায়। টেনে নেয়। মাঝিরা এখানে সাবধান থাকে। কারা যেন নদীর পাড়ে বাঁশের মাথায়  লণ্ঠন বেঁধে রাখে। এখন নেই। মহারানি ব্যারেজ হবার পর নদীতে আর নৌকা চলে কই?
নিখিল গাইছেঃ
‘দেখবি যদি সেই চাঁদেরে
যা যা কারণ সমুদ্রের পারে
।।
যাস নে রে মন সামান্য নৌকায়
সেই নদী বিষম তড়কায়
প্রাণে হবি নাশ, থাকবে অপযশ
পার হবি যদি সাজাও প্রেমের তরীরে
।।
তারণ্য কারণ্য আড়ি
যে জন দিতে পারে পাড়ি
সেই বটে সাধক, এড়ায় ভবরোগ
বসতি হয় তার অমর নগরে’
।।

          আমার নেশা হচ্ছে? কিসের নেশা? চোখ বুজে আসছে। সোনালীর মায়ের গায়ের গন্ধেই আমার এই নেশাটা হচ্ছে? নাকি তার কথা শুনে, ‘হগলে মনে করে আমি নিরক্ষর। না। হগলে মনে করে সোনালীর বাপ আসলে সোনালীর বাপ। না। সোনালীর বাপ আসলে এক চেডেরবাল খানসেনা। আমি তহন ষোলো বছর পার অইয়া গেছি। বাপের চোখের মণি আছিলাম। বাড়ির থিকা তুইল্যা নিল আমারে। বাপে টেকা সাদলো, সোনা সাদলো, খানে নিল না। আমারে নিল। সারা রাইত আমারে বারে বারে, বারে বারে... সকালে আমি একটা লেংডা। দেহনের মতন জিনিস। খানসেনার থিকা খারাপ হেই মানুষের গোল অইয়া দারাইয়া থাহন। দেখন। কেউ মাথা নোয়াইয়া দেহে আমার নীচে দিয়া রক্ত পড়েনি... আমি কুমারী আছলামনি... আমার বাপে আর আইলো না। বাড়ির থিকা কেউ আইলো না। আমি য্যান ক্যামনে এই দেশে আইছি... ঘুমাও নিকি’?
- না, কন
- আমি তোমার ঘরে যাই। তোমার হাতের লেখা তো বিরইন ধানের মতন। আর কী সোন্দর হগলের কতা লেইখ্যা রাহ। হুনো, মাইনসে কু কু করলে গাও মাখবা না... এমন বহুত কু আমি হুনছি। অহন যে শরিলে শরিল নাই, অহনও হুনি। জগতে তুমি যত দুব্বল অইবা, জগৎ তত খানসেনা অইব। কেউ রক্ত বাইর করব, কেউ নুইয়া দেখবো রক্ত বাইর অয়নি... তোমার লেখা বড় ভালো লাগে বাপ... তুমি আমাগো রবিন্ডনাথ।
          আমার চোখ বুজে আসছে। কে যেন ঠিকই ঝুলিয়ে রেখেছে একটা লণ্ঠন নদীর পাড়ে। আকাশপ্রদীপের মতন। দুলছে আলো টা। সজুর ভোমা ঘুড়ির কথা মনে পড়ে। সে-ও একটা ছোট লণ্ঠন আকাশে দুলিয়ে দিতো ওই বিরাট ঘুড়ির সঙ্গে বেঁধে। আর সেই টুইল সুতার একঘেয়ে  একটানা শোঁ শোঁ শব্দ। কে দুলছে এখন? লণ্ঠন নাকি নৌকা? কোথা হতে শব্দটা আসছে? কে যেন এত আনন্দ, এত বাদ্যযন্ত্র, এত এত গানসমেত নৌকাটাকে টানছে। কে? একটা আলোর টানেলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে একটা নৌকা। একটা না-পুরুষ তার হাল ধরে শূন্যতা চিবিয়ে চলেছে। কে যেন গান গাইছেঃ
‘মায়ার গিরাপি কাট
ত্বরায় প্রেমতরীতে ওঠ
কারণ সমুদ্রের নাও, পার হয়ে হুজুর দাও...’
          ধীরে ধীরে সে গানও যেন কোথাও ডুবে যাচ্ছে। একটা রমণীয় ঘ্রাণ ছড়িয়ে সোনালীর মা তার ডানস্তনের কিছুটা ভাস্বর করে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমার লেখা ভুলে যাওয়া কবিতা সে বলে। গড়গড় করে বলে। আমি কেন লিখেছি সেসব? নেই এমন এক নারীকে আমি চিঠি লিখি। সোনালীর মা সেসব থেকে গড়গড় করে বলে। শেষে বলে, ‘বুজলা রবিন্ডনাথ, এমুন কেউ মাইয়ালোক আসলে থাকলে তোমার লেখতে মনে লইত না। তুমি একলা থাহনের জাদুডা শিখ্যা লাইছো...’
          আমি একা হয়ে যাই। সর্বস্ব মিথ্যে হয়ে যায়। সোনালীর মায়ের গায়ের ঘ্রাণে কে যেন জল মিশিয়ে সোঁদা করে দিচ্ছে। এমন তীব্র সে গন্ধ যে, আমি শ্বাস নিতে পারছি না। তারপর আর কিছু মনে নেই।

          সকাল। মাথা ধরে আছে। অনেকক্ষণ লেগে গেল এটা বুঝতে যে আমি আছি মেলাঘর হাসপাতালে।

‘ইয়েস’ বলে লাফিয়ে ওঠেন নন্দ দারোগা। ‘ইয়েস, একটা নৌকাডুবি হইসলো, থ্রি ডেড, ওয়ান মিসিং... ইয়েস... যামুগা, যামুগা... ইয়েস, ইট ওয়াজ রহিম দ্যা গপিস্ট... ইয়েস, হি ওয়াজ মিসিং...’




সোমবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৭

নাচের ক্লাস


অশোক দেব
নাচের ক্লাস

এক.
আয়নার এদিকে আবু। ওদিকে গিনিপিগ। যাজ্ঞসেনীর নাম কে রেখেছে আবু? বাড়িতে সবাই ওটাই ডাকে। বন্ধুরা ডাকে যাজ্ঞ। ফলে সে নিজেকে কী নামে ডাকবে, স্থির করতে পারেনি কোনোদিনএদিকে, হাজার হাজার গিনিপিগ ছুটে ছুটে আসছেঅন্ধ গিনিপিগ। সারা ঘরে ছোটাছুটি করে। দেওয়ালের সঙ্গে, বইয়ের শেলফের সঙ্গে, ড্রেসিং টেবিলের সঙ্গে এরা গিয়ে ঢুঁশ খাচ্ছে। ঠোক্কর খেয়ে উল্টে পড়ছে পড়ে আবার ছোটে।যন্ত্রণাই কোনও প্রাণীকে এমনি ছোটাতে পারে।যাজ্ঞসেনী চোখ বন্ধ করে। তার চোখ দুটি রাজবাড়ির দিঘির মত।  আবু চোখ বন্ধ করলে অতীতকাল কথা বলতে আসে শোনা যায়। এখনও শোনে।  
    কাজল পর?
    হুম
    কেনা?
    হুম, অম্বর কোম্পানির
    বাজে
    মানে?
    চোখের পাতিতে কী পরছ?
    মাশকারা
    হিডা তো আরও বাজে
    মানে?
    এসব কেমিক্যাল কসমেটিক্স বানাইতে কোম্পানি কী করে, জান? এরা গিনিপিগের চোখের মধ্যে প্রথমে লাগায়। পরীক্ষা করনের লাইগ্যা। মানুষের ক্ষতি হইব কিনা টেস্ট করে। কত গিনিপিগ অন্ধ হয়...
সেই থেকে গিনিপিগের দল আয়নার পেছনে এসে আছে। আবু মাশকারা পরে, কাজল পরে, আই লাইনার লাগায়, এরা আয়না থেকে বেরিয়ে এসে সারা ঘরে ছোটাছুটি করে। আবু সাজে না তাই। অন্তত চোখ সাজায় না। আজকাল অবশ্য মাঝে মাঝে সাজে সাজতে হয়। একজনকে ছবি পাঠাতে হয়
জেঠুদা। জেঠুদা হলেন পদ্মাদির বাবা। পদ্মাদি একা।মা নেই তাঁর।ওই বাবার সঙ্গে থাকেন। বিশাল বাড়ি। এখন তাঁদের এই একটিমাত্র বাড়ির জায়গায় আস্ত একটা বাস স্ট্যান্ড হয়েছে। সরকারি। পদ্মদি এখন কোথায় কে জানে। জেঠুদার বিরাট ঘর ছিল দোতলায়। নীচে হল। একদিকের দেওয়াল জুড়ে আয়না। ওটাই নাচের ক্লাস। তার ঠিক ওপরের ঘরটাই জেঠুদার।সেটাও ওই নীচের হলের সমান।
আবু ক্লাস নাইন। আবু ধীরে ধীরে যাজ্ঞসেনী হয়ে উঠছে। শরীর নয়। হোম। কারও কারও কাছে জাস্ট আগুন। কিংবা হোমাগ্নিই তার শরীর হয়ে উঠছে। এই আগুন নিয়ে পথে বেরোনো মুশকিল। তখন বেল বটম। তখন রাজেশ খন্না পেরিয়ে গিয়ে চারিদিকে অমিতাভ বচ্চন। কান ঢাকা চুল। কোমরে গিঁটে গাঁথা শার্ট। আর ওই বুক ভরা কেশ। বোতাম খোলা। ওটাই যা একটু তাকিয়ে দেখার মত। যাজ্ঞসেনী তাকায় না। তখন কথায় কথায় অ্যাসিড বাল্ব। কথায় কথায় ড্যাগার। এর মধ্যেই যাজ্ঞসেনী কাজল পরা শিখে নিয়েছে আইলাইনার লাগাতে শিখেছেনাচের ক্লাসে যায়। কিন্তু মন দোতলায়। কারণ ঘণ্টায় ঘন্টায় বিচিত্র সব শব্দ ভেসে আসে ওই ঘরটা থেকেচার্চের ঘণ্টা বাজে। কত কত পাখি কিচিরমিচির করে ওঠে। বড় পেতলের ঘণ্টায় কে যেন মিহি করে আঘাত করে।নাচ বন্ধ করে দেয় যাজ্ঞথেমে যায়। বাকিরা অভ্যস্ত। যাজ্ঞসেনী তার দিঘি দুটিকে প্রসারিত করে পদ্মাদির দিকে তাকায়।
    যাবি?
    যাই?
    যা, দেখে আয়
আবু যেন একটা ঘূর্ণি। দোতলায় উঠে আসে। দরোজা খোলা। এ ঘরটা থেকেই সব শব্দ আসছে। সোজা ঢুকে পড়ে আবু। ঝালাপালা শব্দের মধ্যে একটা বিশাল চেয়ার। যেন বিছানা। কী কাঠ কে জানে, কালো। পেশল চেয়ার। একটা পা রাখার পাটাতন চেয়ারের কোথা হতে বেরিয়ে এসেছে। তাতে দুটো পায়ের পাতা।একটু ওপরে। লালাভ গোলাপিএকটিকে আদর করছে অন্যটি। আবু থমকে দাঁড়ায়। সারা ঘরে কত যে ঘড়ি। কত রকমের। সিনেমাতেই দেখেছে এরকম সব ঘড়িদেওয়ালে, উঁচুতে লাগানো কতগুলো বিলিতি কুঁড়ে ঘরের মত। তার নীচে ঘড়ি। ছোট দরোজা দিয়ে তখনও একটা একটা কী পাখি বেরিয়ে এসে ডাকছে।একেকটা ঘড়ির ঘর থেকে একেক রকমের পাখি। সার করে অনেকগুলো গ্র্যান্ডফাদার দাঁড় করানো। কত রকমের ঘণ্টা বাজাচ্ছে। চকচকে কাঠের একটা বেশ বড় বাহারি টেবিল। ছোট ছোট পায়া। তার মধ্যে সাজানো সব টেবিল ক্লক। ওরা অবশ্য শব্দ করছে না। উলটো দিকের দেওয়ালে কত রকমের ওয়াল ক্লক। সবাই নানারকম ভাবে বাজছে।  এই ঝালাপালাটা মিঠে।
    রাজীবের মাইয়া?
আবু থতমত খায়। মুখের ওপর থেকে পত্রিকা সরালে দেখা যায় ওই কণ্ঠস্বরের মালিককেবুড়ো হলে মানুষের চোখ ম্লান হয়ে যায়। এঁর এমন নয়। যেন চোখের থেকে আলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। জগদীশ বসুর মত একটা চশমা। ওই চোখ দুটির কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আছে সেটাচোখ সুন্দর না হলে যাজ্ঞসেনী মানুষকে মানুষ মনে করে না। এ মানুষ তো মানুষের থেকে যেন কিছু বেশি। যাজ্ঞ তাকিয়ে থাকে।
    রাজীবের মাইয়া?
    হ্যাঁ
    কত নম্বর?
    দুই
    বাংলা না কেলো?
    কেলো কই না
    পিরিয়ড চলতাছে?
যাজ্ঞসেনী এটাকে বলে স্যবাড়া খাওয়া। মানে থতমত। সে যাবার উদ্যোগ করে।
    দাঁড়াও
আবু দরোজায় দাঁড়ায়। শুয়ে শুয়ে তিনি বলেনযেন ক্লাস নিচ্ছেন। ‘পিরিয়ডের সময় রিহার্সাল না করলে কী হয়? তোমার না খুব ব্যথা করে?’  
আবু কাঁপে। এসব কথা তো পদ্মাদিকে বলেনি সে। তো?
    চোখে ক্যামিকেল কাজল পর ক্যান? কালকে আইয়া কাজল লইয়া যাইও। ক্যামিকেল কাজলের লাইগ্যা কত গিনিপিগ অন্ধ হয় জান? আর ওইটা কী? চোখের পাতায়?
    মাশকারা
    হেইডা তো আরও বাজে...
আবু ছুটে চলে আসে।

দুই.
    কী?
    কী?
    কী?
    আরে, কী?
    কী করছেন?
    সাজি
    নেলপলিস?
    হুম
    গোলাপি?
আবু স্যাবড়া খায়। লোকটা কে আসলে? টুক করে পায়ের ছবি তুলে ফেলে। সেন্ড বাটন টিপে দেয়। সে সত্যি গোলাপি পলিস লাগাচ্ছিল।
    বলিনি?
    স্যালিউট
    হা হা হা
    কী করে বোঝেন?
    বুঝি
    আর কী কী বোঝেন?
    বুঝি আজ অফিস যাবেন না। ব্যথা। তলপেটে। খিমচে ধরে মাঝে মাঝে। ওটি ছাড়ে না
    কী করে?
    মানে?
    মানে, কী করে বোঝেন?
ব্যাস, কী সব ইমোটিক দিয়ে লোকটা বেপাত্তা। এই যে ফেসবুক, হোয়াসস্যাপ, হাইক... আবু আজকাল এসবে বেশ সড়গড় হয়েছে। ফেসবুকে এটা ওটা লেখেভালো ভালো লেখা, স্ট্যাটাস খুঁজে খুঁজে পড়ে। আর ছবি তুলে আপলোড। এই ছিল। কবে যে এই অদ্ভুত লোকটা এসে ফ্রেন্ডলিস্টে ঢুকেছে! এমনকি হোয়াসস্যাপের নম্বরও জেনে গিয়েছে লোকটা। কী করে যে, মনে করতে পারে না আবু। কাছাকাছি কেউ নাম ভাঁড়িয়ে মজা করছে? শান্তু নিজেই? শান্তুনু তো ব্যস্ত থাকে। সারাদিন কাজ।কাজ যেন একটা কোন স্বর্গের মদ। শান্তু কাজমাতাল হয়ে থাকে। রাত নটায় বাড়ি ফেরে। তারপরও এগারোটা অব্দি কীসব করে। ফাঁকে হাল্কা করে খায়। খেতে খেতেই এটা ওটা বলে। নিজের ঘরে গিয়ে জোরে যশরাজের কিছু একটা বাজিয়ে ঘুম। একই শিল্পীকে সে যে কতবার শুনতে পারে। যাজ্ঞসেনী নানা ভাবে বের করতে চেষ্টা করেছে লোকটা কে। শান্তু না তো? নাহ্‌।শান্তু ওসব ফেসবুক,টেসবুককে একদম নিতে পারে না।বলে, বালখিল্য। সময় কোথায়? ওটি শান্তু নয়। আর হলেও ওই প্রমথেশ নামটা ও নিজেকে দেবে না। প্রমথেশ সেন। শুনলেই মনে হয় ফেক।
    ফেক নয় হেটুং করে ওঠে মেসেঞ্জার।
    অ্যাই, আমার এসব খুব ভৌতিক লাগে। প্লিজ। ভয় পাই
    ভয়ের কিছু নেই। প্রচুর জল খান। বলেই অফলাইন হয়ে যায় প্রমথেশ
আজ আবু সেজেছে। মন চাইলো। ওই মাশকারাটা ও শান্তুর জন্য পরে। সানন্দা রাখে যাজ্ঞসেনী। পড়ে না। দেখে। একদিন এক মডেলের চোখ দেখে শান্তু বলেছিল ‘আইল্যাশই হল চোখের আসল গহনা’সেই থেকে কখনো কখনো চোখ সাজায় আবু। আজকাল শান্তু আসে। দেখে না। তবু যে চোখে গহনা পরে। আর সেটি করতে গেলেই ছুটে আসে গিনিপিগ। আর ওই জেঠুদা।
    আমারে কী ডাকবা?
    কী? জেঠু?
    না, জেঠুদা, হা হা হা।
লোকটা তাঁর ঘড়ির মত হাসে। যেন অনেকের হাসি তিনি একা হেসে দিচ্ছেন। ঘড়িগুলো কোনটা জার্মান, কোনটা ইতালীয়, কোনটা বার্মিজ কাঠের তৈরি ক্যাবিনেটে রাখা, কার কত বয়স সব বলেছিলেন একদিন। তাঁর আবার চোখে পরার একটা ঠুলি লেন্স আছে। সেটা চোখে লাগিয়ে ঘড়ির যন্ত্রপাতি সারাই করেনএমনকি ঘড়ির সঙ্গে কথা বলেন তিনি। কী আজব শখ! ‘সময় চলিয়া যায়...আমি এই ঘরে সময়ের কারাগার বানাইলামচলিয়া কোথায় যাইবে’?  অদ্ভুত সব কথা বলেন জেঠুদা। আজ সারা ঘরে ঘিয়ের গন্ধ। কয়েকটা নিভে থাকা প্রদীপ। ছোট ছোট থালা বাসন। সবই রূপার। প্রদীপগুলোও চকচকে। পেতলের? জেঠুদা একটা বাহারি কাজলদান বের করেন। সেটাও রূপার। ছোট ছোট পাথর বসানো। আবুর দিকে এগিয়ে দেন।
    নও। ঘিয়ের প্রদীপের কাজল। ইডাই পরবা। এইসব কাজল চোখের লাইগ্যা ভালো।
    মানে... মা...
    আমার কথা কইবাকালকে পইরা আইবা। আমারে দেখাইবা। তোমার পদ্মদিও আমার করা কাজল পরে। ঘিয়ের।কালকে ঠিক চারটার সময় আইবা। বিকালে।  
আবু গিয়েছিল পরের দিন।ক্লাস ছিল না। অন্যদের ক্লাস। গণেশ বন্দনা হচ্ছিল। আবু দরোজার সামনে দাঁড়াতেই পদ্মদি তাকে দেখে মিটি মিটি হাসে।
    তোর মত চোখ থাকলে আমি শেলিং করতাম।
    শেলিং?
    তুই বুঝবি না। যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যাপার... বলে হা হা হা করে হাসেন, যা দোতলায় জেঠুদাকে দেখিয়ে আয়।
আবু যেতে চায় না। পদ্মদি ঠেলে পাঠানসেও ঢুকেছে অমনি সারা ঘরে বিকেল চারটে। নানারকমের চারটি ধ্বনি।আবু দাঁড়িয়ে থাকে। ওই বিশাল একটা কোম্পানি চেয়ারে আধো শোয়া। হাতে একটা কী বই। সামনে একটা রাজস্থানী চৌকি।বাহারি।
    এইটাতে বও
আবু বসে। মাথা নুইয়ে রাখে। জেঠুদা আলতো করে মুখ তুলে ধরেন তার। তাকিয়ে থাকেন। আবু কিছু করেনি। তার দিঘি দুটোতে জলোচ্ছ্বাস হল।
    কান্দো ক্যান? তুমি না বলে নাচো? দাঁড়াও।
আবু দাঁড়ায়।জেঠুদা চশমা খোলেন।‘আমার চোখের দিকে তাকাও’ আবু তাকায়। ওমা চোখ পাল্টে যায় বুড়োর। ‘এটা হল রাগ, রুদ্র’আবু ও চোখের দিকে তাকাতে পারে না। ‘এটা বাৎসল্য’, এটা অনুরাগ, এটা অভিমান, এটা প্রেম, এটা ক্লেশ, এটা দুঃখ...আবু কী দেখছে! কী করছে এ মানুষ? আবু স্যাবড়া খায়। থতমত। আবু কিশোরী। আবুর ক্লাস নাইন তোলপাড় করে দিয়ে ওই বৃদ্ধ দেখায়, ‘এইভাবে চোখে হাসতে হয়’

তিন.
আবু চোখে হাসে। ভেতর কাঁদলেও তার চোখ হাসে। নাচের ক্লাস আর পদ্মদির কাছে রইলো না। আবু সোজা দোতলায় চলে যায়। কখনো বাংলা কবিতা, কখনো জীববিদ্যা, কখনো ওই সিঁড়িভাঙা অংক। কখনো মেঘদূত। কখনো শকুন্তলা। আবার কখনো সোজা হিন্দি সিনেমা। ফিতার ভিডিও ট্যাপ। পেটুক একটা টিভি। একদিন ‘তেজাব’ দেখল তারা জেঠুদা সিনেমা লাগিয়ে দিয়ে কীসব পড়েন। দেখেন না। তেজাব দেখে আবু কেঁদেছে।  কিন্তু আসল হল ওই নাচের মুদ্রা। নাচ। কখন যে তিনি নাচতে শুরু করবেন ঠিক নেই। মুখ গম্ভীর হয়। চোখ জ্বলে ওঠে। স্ট্রাইপ ট্রাউজার্স আর পাঞ্জাবি। সব পাঞ্জাবিই ঘিয়ে রঙের। দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবি টানটান করলে বুঝতে হবে এখন তিনি নাচবেন। কী করে এমন একজন বৃদ্ধ এত সাবলীল নাচ করেন?  এমনি একা একা গেয়ে গেয়ে চিত্রাঙ্গদা করে দেখান? কী করে?আবুর নামও পাল্টে গিয়েছিল। সৈরিন্ধ্রী। কেমন একটা খটোমটো শব্দ কেমন আদর মেখে মেখে উচ্চারণ করতেন তিনি।
একদিন কাজলদানী ফুরিয়ে গেল।একদিন নাচের ক্লাস বন্ধ হয়ে গেল। মা-ই কী বুঝে সেটা বন্ধ করে দেন। আবু হাঁশপাশ করে। একদিন জেঠুদা আসেন। ‘কই, রাজীব কই’? বাবা হাঁহাঁ করে এগিয়ে যান। জেঠুদাকে কেউ কোনওদিন বাড়ির বাইরে দেখেনি। অথচ তিনি সকলকে চেনেন। সকলে তাঁকে চেনে। জেঠুদা কারও বাড়িতে গেলেন মানে, পাড়ায় তার সম্মান বেড়ে গেল।
    সৈরিন্ধ্রী কই?
    কে, দাদা?
    তোমার ছোট মেয়েটা, যাজ্ঞসেনী?
আবু তো ছুটে রান্নাঘরে। মায়ের কাছে। মা তাকিয়ে আছেন। এ দৃষ্টিটার নাম রুদ্র?
    ‘সমম আলোকিতম সাচি প্রলোকিত নিমীলিতে
উল্লোকিতানুবৃত্তে চ তথা চৈবাবলোকিতম...’
বসার ঘর থেকে জোরে জোরে নন্দিকেশ্বরের দৃষ্টিভেদ আবৃত্তি করেন জেঠুদা। সবটা করেন না।
    তুমি এদিকে আইয়ো তো সৈরিন্ধ্রী
    তাইর নাম আবু, যাজ্ঞসেনী তাইর ঠাকুরদা রাখছে। মা শুনিয়ে শুনিয়ে বলেন।
    আমি রাখছি সৈরিন্ধ্রীকই এদিকে আইয়ো
মাঝখানে পড়ে গেল আবু আর বাবা। আবু মরে যাচ্ছে। বাবা কিছু বুঝতে পারেন না। ছুটে রান্নাঘরে যান। মা বাবাকে টেনে নিয়ে কী যেন ফিসফিস করেনবাবা একবার মায়ের দিকে একবার আবুর দিকে তাকানআবুকে দ্যাখে বাবা। যেন অচেনা কেউ হয়ে গিয়েছে আবুটা। এই বাবাই ওকে বেশি আবু আবু করে। কেমন যেন কঠিন করে তাকালো বাবাটা। আবু কেঁদে ফেলে। নিজের ঘরে চলে যায়।
    ঠিক আছে, ঠিক আছে, কান্দাকাটির দরকার নাই। আমি গেলাম।
চার.
নাচের ক্লাস বন্ধ হল। অ্যানুয়েল প্রোগ্রামের সময় সাতদিন যেতে পেরেছিল আবু। সঙ্গে মা। আবু কান পেতে থাকে। দোতলার ঘর থেকে ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায় না আর। আবু নিজের ছোট হাতঘড়িটা দ্যাখে ঘণ্টায় ঘণ্টায়
    দম দেওয়া হয় না। ভুইল্যা যায় বাবা
পদ্মদি হাওয়ার মধ্যে কথাটা ভাসিয়ে দেন। আবু ফস করে কেঁদে ফেলে। মা কিছুই না বুঝে আদর করতে লেগে যান। ভাবলেন নাচে ভুল করে কাঁদছে মেয়ে।‘মনোযোগ দিয়া কর। কিচ্ছু হইত না’
বড় ক্লাসে যাওয়া হল। নাচ বন্ধ হয়ে গেল চিরতরেআবু স্কুলে যায়। আবু স্যারের বাড়ি যায়। ওদের বাড়ির উল্টো দিকে একটা ছোট শনিমন্দির। জেঠুদা দাঁড়িয়ে থাকেন। এখন তাঁকে সত্যকার বুড়ো মানুষ মনে হয়। বৃদ্ধ। আবু কাছে গিয়ে তাকাতে চায় সে চোখ দুটোর দিকে। অসম্ভব। এ পথটুকু মা এগিয়ে দেন। রিকশায় তুলে দিয়ে তবে ফেরেন। জেঠুদা কোনোদিন এগিয়ে আসেন না। কথা বলেন না। তাকিয়ে থাকেন। চুল সব সাদা হল।একদিন মা চলে গেলে আবু রিকশা ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল। জেঠুদা নেই।কিন্তু নতুন উৎপাতটা আছে। ভুটন।ষাঁড়।তার দৃষ্টিটাকে ঠিক কী বলা যায়? শরীরের যেখানে সেটা লাগে, জ্বলে যায়। জ্বালা করে। ‘আবু প্লাস বুড়া’এই কথাটা ওই-ই সারা পাড়া করেছে। মাধ্যমিক দিয়েই তাই আবুকে ছাড়তে হল পাড়া। বাকি বড় হওয়া, কলেজ, শান্তুনু সব কলকাতায়। শান্তুনুদের পুরনো পরিবার। আগরতলার বনেদি। সে তখন যাদবপুরে পড়ে
    ব্যথা কমল? টুং করে মেসেঞ্জার।
    না
    জল খেলেন?
    হুম
    আপনার অনেকগুলো ঘড়ি?
    শখ
    গোল ডায়ালের কালোটা বেশ সুন্দরছবিটা দেখলাম।
    দাঁড়ান
আবু তার হাতঘড়ির কালেকশন বের করে। সাজায়। স্মার্ট ফোনে ছবি তোলে। সেন্ট
    অত?অতগুলো?
    এটা যে জানলেন না? আপনি তো সব জানেন।
    জানি
    কী জানেন?
    জানি, আপনি পাখিও পোষেন, অনেক পাখি
    কী করে? অ্যাই? কী করে?
    পাখির নানারকম ডাক আপনার ভালো লাগে, কলতান...
    কী করে? কে আপনি? এ পাড়ার?
    নোপ। গতবসন্ত খবর পাঠালো
বলেই বেপাত্তা হয়ে যায় লোকটা। আবু তাকিয়ে থাকে।  বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় খাঁচা। তাতে অনেক পাখি। অনেক। গোধূলি আর ভোরে এরা বাড়ি মাথায় করে। আবু জানালা দিয়ে তাকায়। এদের বাড়িটি পুরনো। পুরনো সব গাছ। বাইরে বাহারি করে খাঁচা গড়ে দিয়েছে শান্তনু। খাঁচাতেও যাতে একটু মুক্তির স্বাদ পাওয়া যায়, তাই বড় বড় খাঁচা। শুধু শান্তুটাই রইলো না। কেমন একটা যন্ত্র হয়েছে সে।  বছরে একবার বেড়ানো। প্রতি রবিবার সিনেমা। ইচ্ছে হলেই একটা ঘড়ি কেনা। আর আঙটি। কত আঙটি যে শান্তু কিনতে পারে। আর সেসব পরতেও হবে। কখনো সব আঙুলেই একটা করে। অফিসে সবাই হাসে। আবু ইচ্ছে করলে খুলে রাখতে পারে, আবার শান্তু আসার আগে পরে নিতে পারে। অমন করে না। এটাও একরকম ঠকানো হয়ে যায়। কিন্তু ওই রুটিন বাঁধা কাজ সব। রুটিন করে, হিসেব করে করা। আবু কেমন দুমড়ে থাকে। এই ফেসবুক এসে ভালো হল। সময় কেটে যায়। শুধু এ লোকটা কোত্থেকে এলো কে জানে। প্রমথেশ সেন। ছবি একটা আছে ঠিক। কেমন উদাসী দুটি চোখ। সাধারণ চেহারা। কিন্তু ওই চোখ দুটিই ওর ভালো লেগেছিল।
    থ্যাংকসটুং করে ওঠে মেসেঞ্জার।
    মানে
    না, এমনিতেই
    হঠাৎ ধন্যবাদ?
    না, ওই চোখে কী একটা পড়ল আমার...
বলেই চুপ। ‘ওয়াজ অ্যাক্টিভ ওয়ান মিনিট অ্যাগো’
পাঁচ.
আজ বারো ডিসেম্বর। আজ বিবাহবার্ষিকী। ফেসবুক বন্ধ করে দেয় আবু। ওই ওখানে কোনও আত্মীয় যদি শুভেচ্ছা পাঠালো, তো সেরেছে। এবার যে কত রকমের কত ঢঙের শুভেচ্ছাবার্তা আসবে তার ঠিক নেই। সেসবের জবাব লেখা এক ঝক্কি। ওই মেসেঞ্জারটা আছে। হোয়াসস্যাপ আছে। হাইকও। বাকি সব আছে। একেবারে নিকট জনেদের সঙ্গে কথা হয়। ভালো হল, আজ মুসলিমদের কী একটা পার্বণ। অফিস ছুটি। শান্তু সকালে স্নানটান করে বেরিয়ে গেল। মুখ থমথম। অফিসের ঝামেলা কিছু হবে। ওর তো ছুটি নেই। আবু জানে বিকেলে তাড়াতাড়ি চলে আসবে আজ। ওই যশরাজ শুনবে। ছুটির দিনে আবার যোগ হয় জগজিৎ সিং -এর গজল। ওই চাপা,ফ্ল্যাট কণ্ঠ আবুর ভালো লাগে না।যাজ্ঞসেনী সময় নিয়ে স্নান করে। ঠাকুর ঘরে যায়। পাখিদের খাওয়ায়। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। শান্তুকে ফোন করে। কেটে দিয়ে মেসেজ করে, জাস্ট কল ইউ লেটার। আবু অবাক হয়। শান্তুটা কেমন হয়ে যাচ্ছে যেন। ছুটি হলে বাড়িতে থাকছে না। মাঝে মাঝে গন্ধও পাওয়া যায়। ওটি একদম সইতে পারে না আবু। কথা বলে না।কথা না বললেই শান্তুর সব উথালপাথাল হয়ে যায়। ‘আই ফিল অ্যাবানডনড যা খুশি হোক, কথা বলা বন্ধ করবে না’এখন কথা না বললেও উদাস কিছু যায় আসে না ওর। আসলে, অফিসে কাজ বেড়ে গেল। হয়তো।
বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছে। পাখিদের কলরব শুরু হয়ে গেল। আবু ড্রেসিং টেবিলের সামনে আসে। সাজে। চোখে গহনা পরে। মাশকারাও। তাকায়। কত কত গিনিপিগ। ছুটে আসে। সারা ঘরে ছোটাছুটি করে। চোখ বন্ধ করে ফেলে সে। আবার খোলে, আয়নার থেকে সরে চলে আসে বারন্দায়। বেতের ঝোলানো চেয়ার। বসে। কেমন শীতল একটা সন্ধ্যা হচ্ছে। পাখিরা খাঁচায় ওড়াউড়ি লাফালাফি করে। যেন এটাই তাদের আসল বাড়িঘর। শান্তুর মেসেজ এল, দেরী হবে, খেয়ে নিও। ভেতরটা চুপ করে যায় আবুর। সে অনলাইনে আসে, যেন অন্তকালের মত একটা সময় তাকে একা কাটাতে হবে। ওই মেসেঞ্জার, হোয়সস্যাপ, হাইক... সব সব খুলে দেয়।একেকটার নোটিফিকেশনের শব্দ একেক রকম। এই একটা ফোনে কত শব্দ আর সময় বাঁধা পরে আছে!
    হ্যাপি অ্যানিভার্সারি
    থ্যাংকস, এটাও জানেন?
    জানি
    আমি এলেই কী করে টের পান? এই তো দেখলাম, ওয়াজ অ্যাক্টিভ টুয়েন্টি মিনিটস অ্যাগো...
    সময়টা ভুল বলছে, ওটা মিনিটস হবে না
    তো?
    ইয়ার্স হবে, টুয়েন্টি ইয়ার্স...
টুক করে নিভে যায় সবুজ বাতিটা।যাজ্ঞসেনী ভালো করে তাকায় ফোনের স্ক্রিনটার দিকে। চোখ বড় করে।  হাজার হাজার ছোট ছোট গিনিপিগ ছোটাছুটি করছে। ওরা অন্ধ।

(
*'একা এবং কয়েকজন' সাহিত্যপত্রে প্রকাশিত)


  

https://www.amazon.in/dp/B077S5CVBQ/?ref=assoc_tag_sept19?actioncode=AINOTH066082819002X&=asokedeb-21